font-help

এই পোস্টটি 2,690 বার দেখা হয়েছে

বামিয়ানঃ আফগানিস্তানের একটি প্রাচীন বৌদ্ধ কেন্দ্র। শান্তি কুমার চাক্‌মা

আফগানিস্তানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের পটভূমি ঃ

বৌদ্ধ ধমের উত্থানকালে বিশেষত ভারতবর্ষের বাইরে প্রসারকালে যে বিভিন্ন দেশ বা স্থান বৌদ্ধ সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে উলেখযোগ্য অবদান রেখেছিল আফগানিস্তান তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। পালি, সংস্কৃত, চীনা ও তিব্বতী বৌদ্ধ গ্রন্থ এবং হিউয়েনসাঙ প্রমূখ পর্যটকগণের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, বুদ্ধের জীবিতকালেই আফগানিস্তানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার হয়েছিল। আমরা পালি এবং সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থের মাধ্যমে জানি যে, তপস্সু ও ভলিক বুদ্ধের প্রথম গৃহী শিষ্য। বুদ্ধত্ব লাভের অষ্টম সপ্তাহে বুদ্ধ যখন রাজায়তন নামক বৃরে নীচে অবস্থান করছিলেন তখন এই দুই বণিক ভ্রাতা উক্কল দেশ (উৎকল, উড়িষ্যা) থেকে তাদের স্বার্থবাহ বা বণিক সংঘ সহ বুদ্ধগয়া অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। এই দুই বণিক বুদ্ধকে মধুগোলক বা মধু মিশ্রিত নাড়– দান করেছিলেন এবং বুদ্ধ ও ধর্মের শরণ গ্রহণ করে বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। উলেখ্য, তখন ভিু সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের এই ত্রিশরণ তখন প্রচলিত হয়নি। এই দুই বণিক বুদ্ধকে পূজার জন্য বুদ্ধের চুল ও নখ সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের নিজ নগর অসিতঞ্চন নগরে সেই চুল ও নখ ধাতুকে পবিত্র জ্ঞানে সংরণ করে চৈত্য নির্মাণ করেছিলেন। কথিত আছে, অসিতঞ্চন নগরের সেই চৈত্য থেকে প্রতি উপোসথ দিবসে নীল বর্ণের আলো বের হতো। আমাদের আলোচিত এই বণিকগণ আফগানিস্তানের বল্খ বা ব্যাকট্রিয়ার অধিবাসী। কৌশলরাজ প্রসেনজিতের পুত্র বিরুড্ঢভ সিংহাসন আরোহণের পর শাক্যজাতি নিধনে নিয়োজিত হন। এরপর যেসব শাক্য প্রাণে রা পেয়েছিলেন তাদের থেকে এক দল আফগানিস্তানের দিকে পালিয়ে গিয়ে জালালাবাদে (প্রাচীন উড়িয়ান) তাদের নতুন রাজ্য স্থাপন করেন। এই শাক্যদের দ্বারা নির্মিত বৌদ্ধ চৈত্য দর্শন করেছিলেন বলে হিউয়েন-সাঙ তার ভ্রমণ বিবরণীতে উলেখ করেন। তপস্সু ও ভলিকের উপখ্যান, শাক্যদের আফগানিস্তানে পলায়ন এই দুটি ঘটনা ছাড়াও তৎকালে মূল ভারতের সাথে গান্ধার, তশিলা প্রভৃতি জায়গার যোগাযোগ ছিল তা আমরা পালি গ্রন্থে যত্রতত্র দেখতে পাই। মহাভারতে ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারীও গান্ধারের রাজা সুবলের কন্যা। মগধ দেশের জনৈক কুমারভচ্চ জীবক বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। এই কুমারভচ্চ জীবকের তশিলায় বিদ্যার্জনের কথা আমরা পালি গ্রন্থের মাধ্যমে জানি। এরূপে জানা যায় যে, বুদ্ধের জীবদ্দশায় আফগানিস্তানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত হয়।

বুদ্ধের পরিনির্বানের (খ্রিঃ পূঃ ৫৪৩) পরবর্তীতে ভিু সংঘের প্রচেষ্টা এবং রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় বুদ্ধের ধর্ম শ্রীলংকা, বার্মা, থাইল্যান্ডসহ সুদূর জাপান পর্যন্ত প্রসার লাভ করে। সেই সময়ে মূল ভারত ভূমির সাথে বহির্দেশে যোগাযোগের জন্য যে কয়টি রাস্তা ছিল তন্মধ্যে ইতিহাস বিখ্যাত শিল্ক রোড প্রধান। এই শিল্ক রোডের একটি শাখা আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে খায়বার গিরিপথ হয়ে কাশী বেনারস পর্যন্ত এসেছিল। রেশমী বস্ত্রকে পালি গ্রন্থে কাসিকবত্ত বলা হয়।

দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে(বুদ্ধের পরিনির্বানের ১০০ বৎসর পর বৌদ্ধ ভিুদের সম্মেলন) সম্ভুত শানবাসী নামে একজন প্রখ্যাত আদি থেরবাদী থেরর নাম জানা যায়। দ্বিতীয় সঙ্গীতির পরে বৈশালী গ্র“পের ভিুরা আদি থেরবাদীদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে আরেকটি সম্মেলনের আয়োজন করে নিজেদের মহাসংঘ বা মহাসাংঘিক নাম দেন। এর পর পরই আফগানিস্তানের উড়িয়ান-এ (আধুনিক জালালাবাদ) তাঁদের শক্তিশালী কেন্দ্র গড়ে তোলেন। মহাসাংঘিকদের প্রভাব কাটিয়ে আদি থেরবাদীদের প্রভাব প্রতিষ্ঠাতর জন্য সম্ভুত শানবাসী যবনদেশ কিপিন বা কাপিস-এ গমন করেন এবং সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন। আফগানিস্তান ভ্রমণকালে হিউয়েন-সাঙ এই ভিু শানবাসীর সংরতি পাত্র-চীবর দর্শন করেন।

ছবি সূত্রঃ- http://www.mysrilankaholidays.com/aukana-buddha-statue.html

মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ে (খ্রিঃ পূঃ ২৬৯-২৩২) বৌদ্ধ দর্শনের কতিপয় বিতর্কিত বিষয় মীমাংসার উদ্দেশ্যে তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির আহবান করা হয়। সঙ্গীতি পরবর্তী কার্যক্রম হিসাবে বহির্দেশে ধর্ম প্রচার এবং আদি থেরবাদী দর্শনের উপর ভুল মতবাদ খন্ডনের জন্য জনৈক মজ্ঝন্তিক থেরকে কাশ্মীর গান্ধার দেশে এবং মহারতি থেরকে যোন দেশ বা যবন দেশে প্রেরণ করা হয়েছিল। সে সময় যবন দেশ বলতে আফগানিস্তানের  অন্তর্গত গান্ধারে বসতি স্থাপনকারী গ্রীকদের বোঝানো হত। উলেখ্য, বিখ্যাত বৌদ্ধ গ্রন্থ “মিলিন্দ প্রশ্নের” প্রধান চরিত্র রাজা মিলিন্দও এরূপ একজন গ্রীক রাজা। তৃতীয় সঙ্গীতিতে আরো একজন নামকরা গ্রীক ভিু যোনক ধর্মরতি থেরকে অপরন্তক দেশে বা পশ্চিমা দেশে প্রেরণ করা হয়। আমাদের আলোচিত আফগানিস্তান তখন অপরন্তক দেশ, যবন দেশ প্রভৃতি নামে অভিহিত ছিল। এই অপরন্তক, গান্ধার, যোনক-যবণ দেশে ধর্মে অত্যুৎসাহী ভিুসংঘের প্রচারণা ও রাজা মিলিন্দ, সম্রাট কনিষ্ক, সম্রাট অশোকের মত রাষ্ট্রনায়কদের বদান্যতায় সর্বোপরি সাধারণ জনগণের অংশ গ্রহণের ফলে বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার, বৌদ্ধ কেন্দ্র গড়ে উঠে। এসব বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলির মধ্যে বামিয়ান একটি প্রসিদ্ধ স্থান। আমার এই স্বল্প পরিসর নিবন্ধে বামিয়ানের বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

বামিয়ানের ভৌগলিক অবস্থান ঃ

বামিয়ান উপত্যকা হিন্দুকুশ এবং কো-হি বাবা পর্বতের মাঝখানে আফগানিস্তানের  রাজধানী কাবুল থেকে ১২০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের প্রায় ৮,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই বামিয়ান উপত্যকার সীমানা প্রাচীর স্বরূপ পূর্ব-পশ্চিম প্রলম্বিত কো-হি-বাবা পর্বত গাত্রেই বিশ্ববিখ্যাত বামিয়ান বুদ্ধ মূর্তি দুইটি অবস্থিত (বর্তমানে ধ্বংস প্রাপ্ত)। আফগানিস্তানের এই জায়গাটি বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি মিলন কেন্দ্র। বিশেষত বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের বাইরে প্রচার ও প্রসার কালে (দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি থেকে হিউয়েন-সাঙের ভারত ভ্রমণ পর্যন্ত সময়ে) এটি ভারতীয়, গ্রীক, ইরান দেশীয় এবং মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জাতি-উপজাতীয় বৌদ্ধ ধর্মানুগ্রাহীদের সংযোগ স্থল ও প্রচার কেন্দ্র হিসাবে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। বামিয়ান প্রদেশের শুধুমাত্র কো-হি-বাবা পর্বত গাত্রেই বিশ হাজার বৌদ্ধ গুহা নির্মিত হয়েছিল। বুদ্ধের সেবক আনন্দের শিষ্য  জনৈক সম্ভুত শানবাসী ভিু দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির অব্যবহিত পরে এবং জনৈক যোনক মহারতি থেরকে বামিয়ান প্রদেশে স্ব-স্ব দলের বৌদ্ধ দর্শন ও মতবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। ইহা বিখ্যাত শিল্ক রোডের উপর অবস্থিত।

ছবি  সূত্রঃ-  http://www.zimbio.com/member/heroinesworld/articles/n5cuCNSXprH/Ancient+Gandhara+Afghanista

n+Bamiyan+Valley

n+Bamiyan+Valley

বামিয়ান শব্দের তাৎপর্য ঃ

বিখ্যাত প্রতœতত্ত্ববিদ চার্লস ম্যাশন ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে আফগানিস্তান ভ্রমণ করেন। তিনি মনে করেন, বামিয়ান শব্দের অর্থ পৃথিবীর ছাদ। আবার কেউ কেউ মনে করেন ফার্সী শব্দ ‘বুট’ অর্থ বুদ্ধ। বুট শব্দ থেকে বুটিয়ান এবং বুটিয়ান থেকে বামিয়ান শব্দটি এসেছে। বামিয়ান অর্থ দুই বুদ্ধমূর্তির দেশ।

বামিয়ান-এর সংপ্তি বর্ণনা ঃ

বামিয়ান এর প্রাচীন ইতিহাস খুব ষ্পষ্ট নহে। ইতিহাস সম্পর্কে সেরকম এমন কোন প্রাচীন গ্রন্থ কিংবা প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন নেই যার মাধ্যমে এটি প্রসিদ্ধি লাভের ব্যাপারে কোন রকম ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, বিখ্যাত শিল্ক রোড বামিয়ানের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করায় অর্থাৎ বিখ্যাত শিল্ক রোডের একাংশ  বল্খ বা ব্যাকট্রিয়া থেকে বামিয়ান কাপিস, কাবুল হয়ে পূর্বদিকে মূল ভারতের দিকে অগ্রসর হবার রাস্তাতে পড়ার জন্য এটা সার্থবাহ (ঞড়ঁৎরহম সবৎপযধহঃ), পর্যটক, বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী সকলের জন্য  মধ্যপথে আশ্রয়  নেয়ার বা বিশ্রামের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এটা কখনো ঘন বসতিপূর্ণ জায়গা ছিলনা। তবে ধারনা করা হয় যে, যে সকল বৌদ্ধ ভিুরা স্বার্থবাহ নামক ব্যবসায়ীদের সাথে যাতায়াত করতেন তাঁরা বর্ষাবাস (বৌদ্ধ ভিদের তিনমাসের বর্ষা ব্রত) পালনের জন্য এখানে থেকে যেতেন। বৌদ্ধ বিনয় অনুযায়ী তিন মাস বর্ষাব্রত পালন শেষে এবং শীত আগমনের শুরুতেই তারা এই স্থান ত্যাগ করে দুরবর্তী অধিকতর উষ্ণ দেশে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়তেন। তাঁরা মূলতঃ জালালাবাদ, কাবুল, কাশ্মির ও আরো পূর্বদিকে মূল ভারত ভূমি মগধের দিকে অগ্রসর হতেন। ভিুরা সার্থবাহদের সাথে ভ্রমণকালে তাদের নিকট থেকে চতুর্প্রত্যয়ের (অন্ন, বস্ত্র, শয়নাসন ও ওষুধ) আশ্রয় পেতেন। এমনি করে পরবর্তীতে বৌদ্ধ ভিুরা মূলত লোকুত্তরবাদী ভিুরা এটিকে স্থায়ী আবাসস্থল হিসাবে গড়ে তুলতে শুরু করেন। এই লোকুত্তরবাদী ভিুরা পরবর্তীতে পাহাড় কেটে নিজেদের আবাসস্থল হিসাবে গুহা নির্মাণ করেন। পরে পরে গুহার সংখ্যা ছোট বড় কমপে দশ হাজার সংখ্যক সৃষ্টি হলো। বড় বড় গুহার মধ্যে কোন কোনটি উপসোথাগার আবার কোনটি উপট্ঠানসালা বা ডরমেটরি হিসাবে ব্যবহার হত।

লোকুত্তরবাদী ভিু সম্প্রদায়ের কেন্দ্র ঃ

বুদ্ধের পরিনির্বাণের ১০০ বৎসর পরে বৈশালীর বালুকারাম বিহারে জনৈক রেবত স্থবিরের সভাপতিত্বে ৭০০ ভিুর এক সম্মেলনে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে দশবস্তু বা দশ প্রকার বিনয়নীতি নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে ভিুদের একটি বৃহৎ অংশ সম্মেলন থেকে ওয়াক আউট করে চলে যান। এইভাবে দশটি বিনয়নীতি শিথিল করার পপাতী ভিুরা মহাসাংঘিক নাম ধারণ করেন। এই মহাসাংঘিকেরা বৈশালী তথা মগধ থেকে বৃহৎ দুই ভাগে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েন। একভাগ দনি ভারতে এবং অন্যভাগ পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের সুদুর কাশ্মীর, গান্ধার ও আফগানিস্তানের দিকে চলে আসেন। পশ্চিম দিকে আসা এই মহাসাংঘিকেরা পরে আবার পাঁচটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েন। পাঁচটি শাখা হল ঃ- (১) এক ব্যবহারিক (২) কৌকুলিক বা কুরুলক (৩) বহুশ্র“তিয় (৪) প্রজ্ঞাবাদী এবং (৫) লোকুত্তরবাদী। পালি গ্রন্থে লোকুত্তরবাদীদের চৈত্যবাদীও বলা হয়। কারণ, লোকুত্তরবাদীরা চৈত্য পূজার উপর প্রাধান্য দিতেন। মহাসাংঘিকদের এই পাঁচ শাখার মধ্যে লোকুত্তরবাদীরা অধিকতর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হলে তারা বামিয়ান ছাড়াও জালালাবাদ, ফোলাদি উপত্যকার অর্হৎ গ্রাম জনপদ ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়েন এবং সেখানে বৌদ্ধ ধর্মীয় কেন্দ্র গড়ে তোলেন। “মহাবস্তু” নামক লোকুত্তরবাদীদের সংস্কৃত ভায়ায় লিখিত বিনয় গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, লোকুত্তরবাদীরা মহাসাংঘিকদের একটি বিচ্ছিন্ন হওয়া শাখা। এই শাখার প্রতিষ্ঠাতা জনৈক মহাদেব থের। খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দীর সময়ে সম্রাট কনিষ্কের রাজত্বকালে বসুমিত্র থের নামক জনৈক ভিুর পৌরহিত্যে কাশ্মিরের কুন্ডলবন নামক স্থানে চতুর্থ বৌদ্ধ সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয় মহাসঙ্গীতিতে যেমন “কথাবস্তু” রচিত হয়, তেমনি চতুর্থ মহাসঙ্গীতিতে “মহাবিভাষাশাস্ত্র” নামে অন্য একটি গ্রন্থ রচিত হয়। সেই গ্রন্থেও মহাসাংঘিক ও লোকুত্তরবাদীদের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ননা পাওয়া যায়।

লোকুত্তরবাদীদের দার্শনিক মত ঃ

নাম থেকেই বুঝা যায় যে, লোকুত্তরবাদীরা বুদ্ধের কিংবা বিশ্বজগতের সবকিছুতেই অলৌকিকত্বকেই বিশ্বাস করে। তারা লৌকিক জগতকে অর্থহীন মনে করেন এবং লৌকিক জগতের বাইরে এক চিরন্তন সত্য ও শান্তিময় জগতের বিশ্বাস করেন। বুদ্ধের কায়, বাক্য, মন সব কিছুকেই তারা অলৌকিক বলে বিশ্বাস করেন। তারা মনে করেন বুদ্ধের শরীরে বত্রিশ প্রকার অশুচি পদার্থের কোন কিছুই নেই। তারা বুদ্ধের তেজ বা শক্তি, করুনা, আয়ু সবকিছুই অনন্ত ও অপরিমেয় বলে মনে করেন। এই ভাবে লোকুত্তরবাদীরা বুদ্ধকে সব েেত্র লোকুত্তর (লোকোত্তর) বা অলৌকিক মনে করেন। বুদ্ধকে দেবত্ব আরোপ সম্পর্কিত তথ্য বৌদ্ধ শাস্ত্রের প্রারম্ভিক সাহিত্য পালি গ্রন্থাবলীতে পাওয়া গেলেও এই লোকুত্তরবাদীরাই বুদ্ধের প্রতি সবচেয়ে বেশী দেবত্ব আরোপ করেন। লোকুত্তরবাদীদের আর একটি অংশ যোগাচারবাদী সম্প্রদায় থেকে পরবর্তীতে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধ ধর্মীয় শাখা মহাযান মতবাদ জন্ম লাভ করে। লোকুত্তরবাদীরা বুদ্ধকে অলৌকিক অপার্থিব হিসাবে বিশ্বাস করতেন। ফলে তাঁদের বিশ্বাসের প্রতিফলন স্বরূপ বামিয়ানের কো-হি-বাবা পর্বত গাত্রের বিরাটকায় দুটি বুদ্ধমূর্ত্তি খোদাই করেন।

বামিয়ানের দুই বৃহৎ বুদ্ধমূর্তি ঃ

 কো-হি-বাবা পর্বতের পশ্চিম প্রান্তে পর্বতগাত্রে বামিয়ানের সর্ব বৃহৎ বুদ্ধমূর্তি খোদাই করা হয়। ইহার উচ্চতা ৫৫মিটার (বা ১৮৬ ফুট)। এই মূর্তিটি অভয় মুদ্রায় দণ্ডায়মান। বুদ্ধের চীবর পূর্ণ পরিমণ্ডল বা পারুপন করা। অন্যদিকে একই পর্বতের পূর্ব প্রান্তে ৩৫ মিটার উচ্চতায় (১৩৫ ফুট) আরেকটি বুদ্ধ মূর্তি আবস্থিত। হিউয়েন-সাঙ (৬৩০ খ্রিঃ) তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে পূর্বপ্রান্তের মূর্তিকে শাক্যমুনি বুদ্ধ এবং পশ্চিমপ্রান্তের মূর্তিকে শুধু বুদ্ধ নাম উলেখ করেন। ৩৫ মিটার উচ্চতার মূর্তিকে তিনি ধাতু নির্মিত মনে করেছিলেন। এই মূর্তিটি ডান হাত ভুমি স্পর্শ মূদ্রা এবং বাম হাতে পিণ্ড পাত্র। চীবর পূর্ণ পরিমণ্ডল বা পারুপন করা। দুটি মূর্তিই গান্ধার শিল্পের আদলে খোদিত। পণ্ডিতগণ মনে করেন, তুলনামূলকভাবে ছোট মূর্তিটি খ্রিষ্ট্রীয় দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শতকে এবং বড় মূর্তিটি খ্রিষ্ট্রীয় পঞ্চম শতকে নির্মাণ শেষ করা হয়েছিল। মুর্তি দুইটিই পরবর্তীতে খ্রিষ্ট্রীয় ৬ষ্ট অথবা ৭ম শতকে রঙ করা হয় বলে মনে করা হয়।

বামিয়ানে থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্ম ঃ

তপস্সু -ভলিকের কাহিনী ব্যতীত আমরা যতদূর জানি মহাসাংঘিকরাই প্রথম বামিয়ানে তাদের জায়গা করে নেন। এই বামিয়ানেরই অনতিদূরে অহনগরন নামক স্থানে সম্ভুত শানবাসী নামের জনৈক থেরবাদী ভিু থেরবাদী মতবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আগমন করেন। তৃতীয় সঙ্গীতির পরে যেমন বিভাজ্যবাদ বা মূল থেরবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যোন মহারতি (যবন ভিু), মহারতি এবং ধর্মরতিকে অপরন্তক দেশে বা পশ্চিম দেশে প্রেরণ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় সঙ্গীতির শেষে যেমন মহাসাংঘিকেরা বামিয়ান এসেছিলেন, ঠিক তেমনি করে হয়তো সম্ভুত শানবাসী থেরও থেরবাদী মতবাদ প্রতিষ্ঠার বা প্রচারের উদ্দেশ্যে বামিয়ান বা পার্শ্ববর্তী স্থান অহনগরন (বা অর্হৎগ্রামে) এসেছিলেন। হিউয়েন-সাঙ তাঁর ভ্রমণকালে এই অহনগরনে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির প্রখ্যাত থের সম্ভুত শানবাসীর সংরতি পাত্র-চীবর প্রত্য করেন। উলেখ্য, শানবাসী ভিুর সময়ে মহাসাংঘিক বা লোকুত্তরবাদীরা মূল থেরবাদ থেকে কিছুটা বিচ্যুত হয়েছিলেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত মহাযান ধর্মমতের সৃষ্টি হয় নাই। সে হিসাবে অনুধাবন করা যায় যে, বামিয়ান শুধুমাত্র মহাসাংঘিকদের প্রচার ত্রে ছিল না, এটা মূল থেরবাদীদেরও কেন্দ্র ছিল। হিউয়েন-সাঙের বর্ণনা মতে বামিয়ান থেকে অহনগরনের সংঘারাম বা ভিু আবাস মাত্র কয়েক ‘লি’ দূর ছিল।

বামিয়ানের উপর বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিফলন ঃ

দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির পর পরই যদি বামিয়ানে মহাসাংঘিক নামক থেরবাদী ভিুরা গিয়ে থাকেন তাহলে আলেকজান্ডার যখন আফগানিস্তানসহ ভারত জয়ের উদ্দেশ্যে বানিয়ান বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় আগমন করেন তখন বামিয়ানে বৌদ্ধধর্ম চর্চা ইতিমধ্যেই চলে আসতেছিল। আলেকজান্ডার পারস্য জয়ের পর ৩৩০ খ্রিঃ পূর্বাদ্ধে পূর্ব দিকে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করেন। বামিয়ান হয়ে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রমকালে বৌদ্ধ ভিু বা বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের উপর কোন তি বা আক্রমনের তথ্য আমাদের কাছে জানা নেই। সম্ভবত তিনি ধর্ম নিরপেভাবে শুধু দেশ জয়ই করেছিলেন। আলেকজান্ডার নিজ নামে  আফগানিস্তানে তিনটি শহর স্থাপন করেন। সেগুলি হলঃ- (১) হেরাত-আলেকজান্দ্রিয়া (২) আরকোসিয়া-আলেকজান্দ্রিয়া ও (৩) বেগ্রাম-বিহার গ্রাম আলেকজান্দ্রিয়া। জানা যায় যে, আলেকজান্ডার পূর্বদিকে অগ্রসর হতে হতে পরে পাঞ্জাবের রাবি নদী অতিক্রম না করে তার নিজ ভূমি গ্রীসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং মধ্যপথে ৩২৩ খ্রিঃ পূর্বাব্দে বেবিলন শহরে মৃত্যুবরণ করেন। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরে তার সেনাপতিরা নিজ বিজিত অঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করেন। এদিকে মগধের সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তার পশ্চিমাঞ্চলীয় হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করে আফগানিস্তান পর্যন্ত তাঁর শাসন পাকাপোক্ত করেন। সেখানে ভারতীয় শাসন ও শাসকের প্রভাবে বামিয়ানে নিশ্চয়ই বৌদ্ধ ধর্মের উন্নতির সহায়ক হয়েছিল।

আমরা জানি, রাজা অশোকের সময় তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয় এবং অশোক ভারতের অভ্যন্তরে ও বাইরে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে যোগ্য ও প্রচারক ভিু প্রেরণ করেন। মহাবংশ, দীপবংশ, সমন্তপসাদিকা নামক পালি গ্রন্থের মাধ্যমে জানা যায় যে, মূল ভারতের বাইরে শ্রীলংকায় মহেন্দ্র ও সংঘামিত্রা এবং পশ্চিম ভারতের  আফগান্তিানের দিকে প্রেরণ করা হয় তিনজন ভিুকে। তিনজন ভিু হলো ঃ (১) মজ্ঝন্তিক থের (২) যোনক ধর্মরতি থের এবং (৩) মহারতি থের। যদিও এই তিনজন ভিু বামিয়ান এসেছিলেন বা অবস্থান করেছিলেন মর্মে এরূপ কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই, তথাপি আমরা অনুমান করতে পারি এই খ্যাতিমান তিন ভিু তাঁদের মতবাদের অর্থাৎ বিভাজ্যবাদ বা মূল থেরবাদ প্রচারের এক পর্যায়ে অবশ্যই বামিয়ান এসেছিলেন। তাঁরা বামিয়ানের মহাসাংঘিক ও লোকুত্তরবাদীদের মূল থেরবাদে ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করেছিলেন। বামিয়ান থেকে অনতিদূরে ফোলাদি উপত্যাকায় “অহনগরন” গ্রামের মূল থেরবাদীদের কেন্দ্রেতো তারা অবশ্যই গিয়ে থাকবেন। বিখ্যাত পালি গ্রন্থ “মিলিন্দ প্রশ্নের” রাজা মিলিন্দ বা মিনান্দার ছিলেন জাতিতে গ্রীক। তিনি খ্যাতিমান ভিু নাগসেন থের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ধর্মের উন্নতি সাধন কল্পে প্রচুর অবদান রাখেন। পন্ডিতগণ অনুমান করেন তাঁর অলসন্দ (আলেজান্দ্রিয়া) রাজ্য পশ্চিমের বাল্হিখ (ইধষশয) থেকে পূর্বে মথুরা অথবা এলাহাবাদ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর রাজত্বের সময়কাল ছিল খ্রিঃ পূর্ব প্রথম শতাব্দী। তাঁর সময়ের মুদ্রায় ধর্মচক্র, সিংহ, হাতি ইত্যাদি বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতীক পাওয়া যায়। সেই হিসাবে তাঁর রাজ্যে অন্তর্গত বৌদ্ধ কেন্দ্র বামিয়ানের উন্নতির জন্য তিনিও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন বলে অনুমান করা যেতে পারে।

কুশান সম্রাট কনিষ্ক তাঁর রাজ্য ভারত, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং চীনের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তার প্রবল অনুরাগের ফসল হিসাবে তিনি কাশ্মীরের “কুণ্ডলবন” নামক স্থানে চতুর্থ বৌদ্ধ সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এটা মূলত সর্বাস্তিবাদীদের সম্মেলন এবং এখানে পৌরহিত্য করেন একজন সর্বাস্তিবাদী ভিু জনৈক বসুমিত্র। সর্বাস্তিবাদীদের মূল গ্রন্থ “বিভাষা শাস্ত্র” এই সময় রচিত হয়। সর্বাস্তিবাদীদের প্রভাব প্রতিপত্তি বেশি হওয়া সত্ত্বেও বামিয়ানের লোকুত্তরবাদীরা এবং মহাসাংঘিকরা কনিষ্কের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বাদ পড়েননি। পণ্ডিতগণ কনিষ্কের রাজত্ব কালকেই মহাযান বা বুদ্ধযান মতবাদের উত্থান কাল বলে মনে করেন। মুলত কনিষ্কের সময় হইতেই মহাযান মতবাদ ভারত, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, চীন ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়ে। বামিয়ানের অনেক গুহা এই কনিষ্কের সময় খনন করা হয় বলে পণ্ডিতগণ অনুমান করেন। গান্ধার বা ইন্দো-গ্রীক শিল্পের ধারা বা ঘরানাও এই সময়ে আবির্ভূত হয়।

বামিয়ানে বৌদ্ধ সভ্যতার পতন ঃ

মধ্য এশিয়ার হুন জাতি ৪২৫ খ্রিষ্টাব্দে গান্ধার আক্রমণ করে। রাস্তার মধ্যে বিহার, মন্দির বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের আক্রমন থেকে রা পায়নি। তবে সে সময় ভাগ্যক্রমে বামিয়ানের বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলি তাদের হাত থেকে রা পায়। সম্ভবত গান্ধারের পশ্চিম দিক অর্থাৎ বামিয়ান তখন পারস্য রাজাদের অধীন ছিল। বানিয়ানকে তুর্কী শাসকদের আক্রমন থেকে রা করার জন্য পারস্য রাজাগণ বানিয়ানের প্রতিরা সুদৃঢ় করেছিলেন, তাই সেই সময়ে হুনরাও বানিয়ান আক্রমণ করতে সাহস করেনি। বিখ্যাত চীনা পর্যটক ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে বামিয়ানকে বৌদ্ধ ধর্মে প্রসারমান অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন। শুধু বামিয়ান এলাকাতেই তিনি ডজন খানেক বৌদ্ধ বিহার এবং সহস্রাধিক বৌদ্ধ ভিু দেখতে পেয়েছেন। সেই সময় তিনি বামিয়ানের রাজাকে একজন ধার্মিক বৌদ্ধ রাজা হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আরবগণ ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য (ঝবংংধহরধহ) রাজাদের পরাজিত করার পর ৬৯৯-৭০০ খ্রিষ্টাব্দে কান্দাহার এবং একই সময়ে কাবুলের শেষ কুশান রাজাকে পরাজিত করেন। সেই সময়ও বামিয়ানের বৌদ্ধ স্থাপনাগুলির কোন আক্রমণ করা হয়নি এবং সেগুলি অত অবস্থায় থেকে যায়। ইহার এক শতাব্দীর পরেও বিখ্যাত কোরিয়ান ভিু পর্যটক হুই চাও (ঐঁর-পযধ’ড়) ৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে বামিয়ানে বর্ধমান বৌদ্ধ ধর্ম দেখতে পান। তিনি বামিয়ান, কাক্রাক ও অহনগারানে হীনযান এবং মহাযানী উভয় মতাবলম্বীদের প্রসারমান বৌদ্ধ ধর্ম দেখতে পান। এতদিন পর্যন্ত বামিয়ানের রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী থাকার পরে আব্বাসীয় রাজবংশের সময়ে আল-মনসুর (৭৫৫-৭৭৫) অথবা আল মেহেদীর (৭৭৫-৭৮৫ খ্রিঃ) রাজত্বের পর থেকে এখানে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের সূচনা হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুসারী এবং বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলি অবহেলিত হয়। তখন থেকে সেখানকার বৌদ্ধরা মৌলবাদী মুসলমান রাজাদের গণহত্যা অথবা ধর্মান্তর করণের স্বীকার হন। বামিয়ান ৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে বল্হিখের তুর্কী গভর্ণর আলপ্তগীন ও তাঁর দাস সবুক্তগীন কর্তৃক পুনরায় আক্রমণের শিকার হয়। সবুক্তগীন গজনবী বংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং গোঁড়া মুসলিম শাসক। তাঁর আমলেই আফগানিস্তান সম্পূর্ণরূপে মুসলিম শাসনাধীনে চলে আসে। ১২২২ সালে চেঙ্গিশ খানের সৈন্য বাহিনী বামিয়ান আক্রমণ করে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করে। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭খ্রিঃ) একজন গোঁড়া মুসলিম ছিলেন। তিনি বামিয়ানের বৃহৎ দুই বুদ্ধ মূর্ত্তিগুলিকে কামানের গুলি মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অতি সম্প্রতি তালেবানীদের মিশাইলে ধ্বংস না হওয়া পর্যন— বৃহৎ মূর্ত্তিগুলিতে আওরঙ্গজেবের আমলের কামানের দাগ দেখা যেত। যে বামিয়ানে একদা সুদূর চীন-কোরিয়া থেকে পর্যটক, পণ্ডিত ও জ্ঞান পিয়াসী মানুষের আগমন ঘটেছিল, যেখান থেকে হুন, যবন, শক, পাঠান, আর্য, অনার্য সকলেই বুদ্ধের অমৃতময় মৈত্রী সুধা পান করেছিলেন এবং যেখান থেকে একদা বুদ্ধের অমৃতময় মৈত্রী বাণী পশ্চিমে মিশর, পূর্বে চীন-কোরিয়া-জাপান পর্যন্ত প্রসার হয়েছিল, সেই উজ্জ্বল জ্ঞানময় ও মৈত্রীময় তীর্থ ভূমির গৌরব গাথা অবশেষে ইতিহাসের কোলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হল এবং বুদ্ধের বহুভাষিত আপ্তবাক্য “অনিত্য-দুঃখ-অনাত্মের” জয় হল।

সহায়ক গ্রন্থাবলী ঃ-

এই বিভাগের আরো পোস্ট

Tags: