font-help

এই পোস্টটি 1,240 বার দেখা হয়েছে

পার্বত্য চট্টগ্রামের গ্রামীণ সাধারণ বনঃ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে তাৎপর্য। হরি কিশোর চাকমা

পটভূমি ঃ

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশে প্রধান পাহাড়ি অঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদ আর সৌন্দর্যে ভরপুর পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ অর্থাৎ পাঁচ হাজার ৯৩ বর্গ কিলোমিটার। দেশের দণি-পূর্বাংশের এ অঞ্চলটি অন্যান্য এলাকার চেয়ে ভৌগলিক গঠন ও বৈশিষ্ট, কৃষির প্রকৃতি ও ব্যবহার এবং ভূমির গুণাবলী সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ছোট ছোট পাহাড় টিলা থেকে চার হাজার ফুট উচ্চতা সম্পন্ন পর্বতশ্রেণী রয়েছে। সবুজ প্রাকৃতিক বনে ঢাকা এসব পাহাড় পর্বত শ্রেণীতে রয়েছে প্রাকৃতিক ছড়া, ঝরনা, নানা প্রকার বৃরাজি বনৌষধি। রয়েছে জীববৈচিত্র্যের সম্ভার।

বাংলাদেশের বনভূমি ঃ

বাংলাদেশে প্রধানত তিন ধরণের বন রয়েছে। ১. চিরসবুজ বা আধাসবুজ গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন; যার পরিমাণ ছয় লাখ ৪০ হাজার হেক্টর। এ বন দেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাসমূহ অর্থাৎ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে পড়েছে।  ২. উষ্ণ বা শুষ্ক বন ; যার পরিমাণ এক লাখ ২২ হাজার হেক্টর। এ বন শালবন বলে সুপরিচিত। দেশের মধ্যাঞ্চলীয় সমতল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়ে এ বন  এবং ৩. উপকুলীয় প্যারাবন বা সুন্দরবন ; যার আয়তন পাঁচ লাখ ২০ হাজার হেক্টর। লবণপানি ও মিষ্টিপানির মিশ্রণ এলাকায় খুলনা জেলার দণি-পশ্চিমাঞ্চলের দেশের সবচাইতে বড় সুন্দরবন।  এ ছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় উল্লেখযোগ্য প্যারাবন রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ঃ

এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সব এলাকা ছিল প্রাকৃতিক বনে ঢাকা। জনসংখ্যা ছিল খুৃবই কম এবং প্রায় সবাই ছিল আদিবাসী। যাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু নিজেদের আয়ত্ত্বে রাখার বিষয়টি ছিল গৌন। পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে বনকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ১. সংরতি, ২, রতি ও ৩, অশ্রেণীভূক্ত বনাঞ্চল। ১৮৭০ দশকে পার্শ্ববর্তী বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) থেকে সেগুন গাছের বীজ এনে রোপনের মাধ্যমে সংরতি বন গড়ে তোলা হয়। এ বনে সাধারণ মানুষের প্রবেশ অধিকারও সীমিত করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে চারটি বড় ও কিছু ুদ্র ুদ্র এলাকা নিয়ে সাত লাখ ৯৬ হাজার ১৬০ একর সংরতি বনভূমি রয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া সরকার ১৯৮০ ও ৯০ দশকে তিন পার্বত্য জেলার (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) ৮৩ টি মৌজায় আরও দুই লাখ ১৮ হাজার একর এলাকায় সংরতি বন করার ঘোষণা দেয়, যা প্রাকৃতিক বন ও জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন ধরণের বনের মধ্যে অশ্রেণীভূক্ত বনাঞ্চলকে ঘিরে সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ শ্রেণীর বনকে সরকারি ভাষায় খাস বলে উলেখ করা হয়। তবে এসব ভূমির অধিকাংশই আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকারের জুমভূমি। এরমধ্যে আরও রয়েছে সমষ্টিগত বনভূমি যা গ্রামবাসী বা মৌজাবাসী মিলে বিভিন্ন নামে সংরণ করে।

উল্লেখিত খাস জমিতে সরকার কখনো সংরতি বন সম্প্রসারণ, বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা, ইকোপার্ক নির্মাণসহ নানা পরিকল্পনা নিয়ে থাকে। তাতেও ব্যাপক প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে যায়।

আদিবাসী ও প্রাকৃতিক বন ঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়া ১৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে বৈচিত্র্যময় ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তবে সব আদিবাসী সম্প্রদায় বনকে নিয়ে একই ধারণায় বিশ্বাসী। তারা প্রাকৃতিক বনকে কোনো সময় ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে দেখে না। পাহাড়, বন আর প্রাকৃতিক সম্পদকে আদিবাসীরা দেখে সমষ্টিগত সম্পদ হিসেবে। আর এসব সম্পদকে কোনো বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে না দেখে তা সংরণে আদিবাসীদের রয়েছে ঐতিহ্যগত জ্ঞান। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কাজে আদিবাসীদের জুমচাষি বন ধ্বংসকারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস ল্য করা যায়। অথচ যেখানে আদিবাসীরা থাকে সেখানে কিছু না কিছু প্রাকৃতিক বনের সন্ধান পাওয়া যায়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবীব্যাপী প্রাকৃতিক বনকে যখন সরকার ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে তার হেফাজতে নিয়েছে তখন থেকে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হতে শুরু করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসও তাই বলে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক বনকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয় বৃটিশ আমলে ১৮৬০ সালে, যখন কোনো কোনো অঞ্চলকে রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরতি বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে ওই অঞ্চলে প্রাকৃতিক বন কেটে সেগুন বাগান সৃজন করা হয়। এরপর ওই বন এলাকায় যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী আদিবাসীদের প্রবেশও নিষিদ্ধ অথবা সীমিত হয়ে পড়ে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার শুরু হয় বিংশশতাব্দীর শুরু থেকে। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ল্েয রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে নির্মাণ করা হয় বাঁধ। এতে প্রায় ৭০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সৃষ্টি হয় কৃত্রিম জলাধার। পুরাতন রাঙামাটি শহরসহ পানিতে ডুবে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪০ শতাংশ প্রথম শ্রেণীর ধানী জমি আর হাজার হাজার একরের বনভূমি, জনবসতি, রাস্তাঘাট। উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে এক লাখের বেশি মানুষ যার অধিকাংশই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। এরপর এসব উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপনে রাঙামাটির কাচালংসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও হাজার হাজার বনাঞ্চল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মানুষের জীবনজীবিকা নির্বাহেও চাপ পড়ে প্রাকৃতিক বনের ওপর।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সমষ্টিগত বন ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্মরণাতীতকাল থেকে আদিবাসীরা বন আর ছড়াকে (ঐরষষ ংঃৎবধস) দেবতার তুল্য মনে করে আসছে। সে কারণে গ্রামীণ সাধারণ বনকে বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়; কোথাও মৌজাবন, কোথাও রাজধানী, কোথাও রিজার্ভ বন, সার্ভিস, বাম, রিজার্ভ  ইত্যাদি।

এখানে ল্য করার বিষয়, সংরতি বন সম্প্রসারণ ও সরকারি স্থাপনা নির্মাণের কারণে সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্থ  হয় সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এসব জনগোষ্ঠী বনের সঙ্গে ওঠপ্রোতভাবে জড়িত এবং বন ব্যবস্থাপনায় তারাই বেশি দ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৮০ ও ৯০ দশকে সরকার সংরতি বন সম্প্রসারণের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাতে সবচেয়ে বেশি তির শিকার হয়েছে রাজস্থলী উপজেলার খিয়াং জনগোষ্ঠী। খিয়াং ও মারম অধ্যুষিত ধনুছড়ি ও কুক্যাছড়ি মৌজার সম্পূর্ণ জায়গা ইতিমধ্যে সংরতি বন হিসেবে চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসনে প্রাকৃতিক বন ঃ

বহুজাতিক কোম্পানির বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণেও পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজার হাজার একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় টোব্যাকো (তামাক) কোম্পানির চুলিতে ব্যবহৃত কাঠের উদাহরণ দেওয়া যায়। রাঙামাটি, বান্দবান ও খাগড়াছড়ি এ তিন পার্বত্য জেলায় ধানী জমি ও মৌসুমী ফসলের জমি কম হওয়া সত্ত্বেও এসব কোম্পানি প্রচুর অর্থের বিনিময়ে এসব খাদ্য উৎপাদনে যোগ্য সমতল জমিতে তামাক চাষে স্থানীয় লোকজন ও চাষিদের উৎসাহিত করছে। আর তামাক চুলিতে ব্যবহারের জন্য হাজার হাজার মণ পরিপ- অপরিপ কাঠ পেড়ানো হচ্ছে। এতে ও প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হচ্ছে।

এখানে রাঙামাটি জেলায় বিভিন্ন তামাক চুলিতে কী পরিমাণ কাঠ পোড়ানো হয় তার একটি কেস স্টাডি তুলে ধরা হলো। বিভিন্ন এলাকার তামাক চাষি ও সংশিষ্ট লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে; জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে তামাক চাষের ব্যাপার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন উপজেলার তামাক চাষি ও কোম্পানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাঙমাটি জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে পাঁচ উপজেলায় এক হাজার ৫২৮ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়। এরমধ্যে বাঘাইছড়ি উপজেলায় ৮০০ হেক্টর, লংগদু উপলোয় ৩২০ হেক্টর, বরকল উপজেলায় ১২৮ হেক্টর, জুরাছড়ি উপজেলায় ১২০ হেক্টর এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় ১৬০ হেক্টর। অন্য পাঁচ উপজেলায় তামাক চাষ হয় কম। তামাক চাষিরা জানান, প্রতি হেক্টরে উৎপাদিত তামাক শুকানোর জন্য কমপে একটি চুলি বসাতে হয়। প্রতিটি চুৃলিতে বছরে ৫০০ মণ কাঠ পোড়াতে হয়।  সে হিসাবে তামাক শুকাতে বছরে সাত লাখ ৬৪ হাজার মণ কাঠের প্রয়োজন হয়। গত ২৫ মার্চ রাঙামাটি জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম দণি বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) আমির হোসাইন চৌধুরী তামাক চাষের কারণে বন ধ্বংস হচ্ছে বলে জানান। তিনি তামাক চাষ বন্ধের উদ্যোগ নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করা হলে আমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিলাইছড়ি উপজেলার রাইংখ্যং সংরতি বনের ফারুয়া ইউনিয়নে তিন বছর আগে প্রচুর শাকসবজি উৎপাদন হতে দেখা গেছে। এখন সেসব জমিতে শুধু তামাক আর তামাক। ফলে ওই এলাকার লোকজনকে চড়া দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। আর তামাক পাতা শুকানোর জন্য বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটা হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে; যা বনের জন্য খুবই প্রয়োজন। একইভাবে বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, জুরাছড়িতেও বনের অপরিপ কাঠ তামাক চুলিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তিনি জানান। স্থানীয় লোকজনই বনের গাছ কেটে তামাক চুলিগুলোতে বিক্রি করে বলে স্বীকার করেছেন একাধিক চুলির মালিক।

গ্রামীণ সাধারণ বনের আইনগত ভিত্তি ঃ

সমষ্টিগগত বন রার প্রথম সরকারি স্বীকৃতি মিলে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিতে। এ শাসনবিধির ৪১ ধারার উপধারা (বি) মতে, এলাকার মৌজা হেডম্যানের নেতৃত্ব আদিবাসীরা প্রত্যেক মৌজায় একটি সংরতি বন রাখতে পারবেন। যেখান থেকে হেডম্যান বা কমিটির অনুমতি সাপেে প্রয়োজন মতো স্থানীয় লোকজন বনের গাছ-বাঁশ, বনষৌধি সংগ্রহ করতে পারবেন।

এরপর কাপ্তাই বাঁধ সৃষ্টির পেছনে যে কয়টি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল তার মধ্যে বনজ সম্পদ আহরণ ছিল অন্যতম। কাপ্তাই বাঁধ সৃষ্টির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ করে রাঙামাটি জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় পর্যন্ত নৌ যোগযোগের সুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় বনজ সম্পদ দ্রুত বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়। এ অবস্থায় ১৯৬৫  সালের ৩ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম এস রহমান ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ মতে একটি সার্কুলার (স্মারক নং- ২৩৮৪ (৪০))  জারি করেন। সেখানে স্থানীয় লোকজনের একটি মৌজা রিজার্ভ রাখার অধিকার দেওয়া হয়।

ওই সার্কুলারে বলা হয়, মৌজাস্থিত লোকজন তাদের পারিবারিক ব্যবহারের জন্য বনের গাছ-বাঁশ বা যে কোনো সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবেন। এসব বন ১০০ একর বা তারও বেশি এলাকা নিয়ে গঠন করা যাবে। সংশিষ্ট হেডম্যান গ্রামের  কার্বারিদের এসব বন সংরণের ব্যবস্থা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ ও সম্পদ আহরণসহ প্রয়োজনীয় রণাবেণের ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশনা দিতে পারেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সাধারণ বনের সর্বশেষ সরকারি স্বীকৃত মিলে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সভায় (স্মারক নং রাঃপাঃজেঃপ/ভূমি/১৪ তারিখঃ ২২/১১/০৮ খ্রীঃ)।  সভার কার্যবিবরণী ও  পরিষদের ভূমি কর্মকর্তার পাঠানো পত্র অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার ১৫৭ নং ছোট হরিণা মৌজার বাজেইছড়া গ্রামের জনসাধারণের পে মি. রজনী কুমার কার্বারী গং কর্তৃক রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে গ্রামীণ বনভূমি সংরণের বিষয়ে ৮০ একর জায়গা সমষ্টি মালিকানায় ভোগ করার আবেদন করেন। পরিষদের সেপ্টেম্বর ২০০৮ মাসের সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং উক্ত গ্রামীণ বনভূমি সংরণের বিষয়টি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে সভায় মতব্যক্ত করা হয়। আবেদন মোতাবেক উক্ত সমষ্টিগত মালিকানায় ভোগদখলকৃত জমি অন্য কারও  নিকট বন্দোবস্ত বা অন্যবিধভাবে হস্তান্তর না করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশিষ্ট সকলকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয় ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশ ঃ

বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। ধনী দরিদ্র, উন্নত উন্নয়নশীল সব দেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সোচ্চার। যদিও দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত দিক নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এটা সবদেশ স্বীকার করছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে পরিবেশের ভারসাম্য রার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ পরিবেশের তিকর কার্যক্রমের সঙ্গে খুব একটা জড়িত না হলেও সমুদ্র উপকূলীয় দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত। তবে এটাও ঠিক যে, একটি দেশে যে পরিমাণ বনভূমি থাকার কথা তার চেয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে।

ফরেস্ট্রি মাস্টার পান এবং বাংলাদেশের বননীতি অনুসারে ( বাংলাদেশের বিপন্ন বন- ফিলিপ গাইন, ২০০৫) দেশে বর্তমানে সাত লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর বা ৬ শতাংশ মাত্র বন অবশিষ্ট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি করা বন এবং গরানবন বা সুন্দরবন। তবে তৈরি করা বনকে সত্যিকার অর্থে বন বলা যাবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারণ এ ধরণের বন সাধারণত স্বল্প মেয়াদি এবং লাগানোর ১০ বছর বা কিছু আগে পরে এসব বন কেটে ফেলা হয়। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাল্প উড বাগান। রাঙামাটির কাপ্তাই ও রাজ্স্থলী উপজেলা এবং বান্দরবানের রেয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় লাগানো পাল্প উড বাগানকে বনবিভাগের ভাষায় সংরতি বন হিসেবে অভিহিত করা হয়। মূলত কর্ণফুলী পেপার মিলের কাঁচামাল হিসেবে সৃজিত পাল্পউড বাগান গড়ে তোলা হয়েছে প্রাকৃতিক বনকে ধ্বংস করে। এসব বনে কোথাও বন্য পশুপাখির বিচরণ আছে এমনটি কেউ দেখেছেন বলে মনে হয় না। পাল্পউ বাগান প্রতি ৮ থেকে ১০ বছর অন্তর কেটে ফেলা হয়। আর এসব বাগানে অন্য কোনো গাছকে বড় হতে দেওয়া হয় না। সুতরাং এ ধরণের বনকে কোনো অবস্থাতে পরিবেশ রাকারী বন হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।

এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামে যে গাছটি অর্থকরী হিসেবে শতাধিক বছর ধরে সাধারণ মানুষ ও সরকার সৃজন করে আসছে তা হলো সেগুন গাছ। সেগুন গাছের আয়ুষ্কাল দীর্ঘ হলেও  তাও পরিবেশের জন্য উপকারীতো নয়ই বরং চরম তিকর বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সব সংরতি বন সেগুন গাছ সৃজন করা হয়েছে। যদিও এসব সেগুন গাছ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় উজাড় হয়ে গেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রচুর বাগানেও সেগুন গাছ লাগানো হচ্ছে।

এরপর রয়েছে রাবার বাগান। রাবার বাগানোর আয়ু দীর্ঘ হলেও সেগুন গাছের মতো নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি রাবার বাগান গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে বান্দরবান জেলায় ভূমি ইজারা দিয়ে রাবার বাগান করতে সরকারি ঋণ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। এসব বাগানও উঠেছে প্রাকৃতিক বনের জায়গায়। সেগুন, পাল্পউড ও রাবার গাছ পার্বত্য চট্টগ্রামের কী পরিমাণ জায়গা জুড়ে রয়েছে তার সঠিক হিসাব পাওয়া সহজ নয়। এসব একক প্রজাতির গাছ পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রায় সহায়ক নয়। এসব গাছও সরকারি হিসেবে বনের হিসাবের আওতায় রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

গ্রামীণ সাধারণ বন ও পরিবেশ প্রতিবেশ ঃ

গ্রামীণ সাধারণ বন পরিবেশ প্রতিবেশের আঁধার। গ্রামীণ বন হঠাৎ করে তৈরি হয় না। সেখানে কোনো গাছ রোপনেরও প্রয়োজন নেই। পশুপাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে এক বন থেকে অন্য বনে গাছ স্থানান্তরিত হয় প্রাকৃতিক নিয়মে। শত শত বছর ধরে সেসব গাছ বড় হতে থাকে। গ্রামীণ বনে শত প্রজাতির গাছ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক বনে তিনটি স্তর বা আচ্ছাদন থাকে। প্রথমস্তরে লতাগুল্মসহ নানা প্রকার বনৌষধি ও ছোট ছোট গাছপালা, দ্বিতীয়স্তরে মধ্যম স্তরের মাঝারি আকারের গাছ এবং উঁচু স্তরে বড় বড় শতবর্ষীয় গাছপালা। বনের বড় বড় গাছের শিকড়ের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ কর। প্রাকৃতিক বনের আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হল বনে প্রচুর বাঁশ জন্মে। সে কারণে প্রাকৃতিক বনের ঝরনা-ছড়া সারা বছর সচল থাকে। বনে থাকে বিভিন্ন প্রকার গাছপালা, বনজ ফল, লতাগুল্ম; যা বন্য পশুপাখির ও জীবজন্তুর খাদ্যচক্র হিসেবে অতুলনীয়। ফলে বন এলাকায় বন্যপ্রাণীর আনাগোনা থাকে অবাধ। তবে সাম্প্রতিক জনসংখ্যা ও জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় পশুপাখি, বন্য জীব জন্তুর এক বন থেক অন্য বনে আসা যাওয়া কমে যাচ্ছে। দুই বনের মাঝখানে এসব জনবসতি গড়ে উঠায় বন্যপ্রাণীর বিচরণ সীমিত হয়ে পড়ছে। অথচ বন্য প্রাণীর অবাধ বিচরণের কারণে পরিবেশ প্রতিবেশের ভারসাম্য রা হয় এবং জীববৈচিত্র্যের সম্ভারও বৃদ্ধি পায়।

গ্রামীণ বন এলাকায় জুমচাষ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। ঘন সবুজ নিবিড় বন, বনের পাহাড়ি ঝরনার উৎস, ছড়া, পশুপাখির বিচরণ ত্রে নিয়ে আদিবাসীদের রয়েছে নানা মিথ বা রূপকথা। এসব ধারণা থেকে আদিবাসীরা বনে ঢুকে নানা নিয়ম শৃংখলা মেনে চলে; এসব নিয়ম শৃংখলা বর্তমানে আদিবাসী জ্ঞান হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে। আদিবাসীরা বনের গভীরে চিৎকার চেঁচামেচি করে না, কোনো পাহাড় ঝরনা বা ছড়ায় মলমূত্র ত্যাগ করা আদিবাসীদের এক প্রকার নিষিদ্ধ- এভাবে নানা নিয়ম কানুন পালনের মধ্য দিয়ে আদিবাসীরা বন, বনের পশুপাখি ও পানির উৎসগুলোকে নিরাপদ রাখে।

গ্রামীণ বন ব্যবস্থাপনা ঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের গ্রামীণবন সাধারণত একটি বা কয়েকটি গ্রাম অথবা একটি মৌজার লোকজনকে নিয়ে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এর নেতৃত্বে থাকেন গ্রামের প্রধান বা কার্বারি অথবা মৌজা প্রধান বা হেডম্যান। তবে প্রায় সব গ্রামের লোকজনকে নিয়ে থাকে কমিটি। অনেক এলাকায় গ্রামীণ বনকে নিয়ে গড়ে উঠেছে আইন শৃংখলা বিষয়ক কমিটি, মন্দির কমিটি, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিসহ নানা সামাজিক উন্নয়নমূলক কমিটি। কমিটির সদস্যদের সিদ্ধান্ত বা অনুমতি ছাড়া কেউ বনের গাছবাঁশ কাটতে পারে না। তবে গ্রামের কোনো দরিদ্র পরিবার বাড়ি তৈরি করতে কমিটির অনুমতি নিয়ে বনে প্রয়োজন মতো গাছ, বাঁশ, শন কাটতে দেওয়া হয়। এছাড়া গ্রামের ধর্মীয় ও শিা প্রতিষ্ঠানসহ যৌথ মালিকানধীন প্রতিষ্ঠান নির্মাণে বনের গাছ বাঁশ কাটা হয়। অনেক গ্রামে বা কমিটিতে বনের গাছ বাঁশ বিক্রি করে ফান্ডও তৈরি করা হয়। কারো বিপদে আপদে সে ফান্ড ব্যবহার করা হয় কখনো সুদে, কখনো বিনা সুদে। এভাবে গ্রামীণবন আদিবাসীদের সামাজিক জীবনে প্রত্য ও পরোভাবে নানা ভূমিকা রাখছে।

গ্রামীণ সাধারণ বন সংরণে বেসরকারি উদ্যোগ ঃ

জীববৈচিত্র্য রা ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে পরিবেশের ভারসাম্য রার বিকল্প নেই। আর পরিবেশের ভারসাম্য রা করতে পারে  প্রাকৃতিক গ্রামীণ সাধারণ বন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও ‘টংগ্যা’ এলাকার অধিবাসীদের গ্রামীণ সাধারণ বন রায় সমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সম্পর্কে সচেতন করা ল্েয ‘ঈড়হংড়ষরফধঃরহম ঈড়সসঁহরঃু জরমযঃং ড়াবৎ ঘধঃঁৎধষ জবংড়ঁৎপবং ভড়ৎ ঈড়হংবৎাধঃরড়হ ড়ভ ঊহারৎড়হসবহঃ ধহফ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ’ সংেেপ সিসিআরএনআর প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ২০০৮ সালে জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত  গৃহীত এ প্রকল্পে অর্থায়ন করে ডেনমার্ক সরকারের সাহায্য সংস্থা ডানিডা। এরআগে ‘প্রটেকশন অব ভিলেজ কমন ফরেস্ট ইন চিটাগাং হিল ট্রাক্টস’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দুই বছর মেয়াদে প্রকল্পটির ধারণা ও নকশার ভিত্তি তৈরি করা হয়। প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার ছয়টি উপজেলায় ৩৮ গ্রামীণবন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত  হচ্ছে। গ্রামীণ সাধারণ বন সংরণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

গ্রামীণ সাধারণ বন সংরণে প্রতিবন্ধকতা ঃ

১.         পার্বত্যচুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া;

২.         পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের যথাযথ দায়িত্ব ও মতার অভাব;

৩.         বন আইনে সমষ্টিগত ভূমি অধিকার ও গ্রামীণ সাধারণ বনের স্বীকৃতি না থাকা;

৪.         আদিবাসীদের ভূমি ও বনের ওপর অধিকারসহ প্রথাগত অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকা;

৫.         সরকারের সংরতি বন সম্প্রসারণ কার্যক্রমে পরিবেশের দিকটি উপেতি থাকা;

৬.         জনসংখ্যা বৃদ্ধি;

৭.         স্থানীয় অধিবাসীদের দারিদ্র্যতা ও আয়োর উৎসের স্বল্পতা।

গ্রামীণ সাধারণ বন সংরণে চ্যালেঞ্জ ঃ

১.         গ্রামীণ সাধারণ বনসমূহের সরকারি স্বীকৃতি এবং সমাজের নিকট সরকারিভাবে মালিকানা প্রদান;

২.         সমষ্টিগত মালিকানাধীন গ্রামীণ সাধারণ বনসমূহের পরষ্পরের মধ্যে করিডোরের ব্যবস্থা করা, যাতে বন্য পশুপাথি খাদ্য অন্বেষণ ও নিরাপত্তার জন্য এক বন থেকে অন্য বনে চলাচল করতে পারে;

৩.         সমষ্টিগত মালিকানাধীন বনগুলোকে অর্থনৈতিক খাতে বিনিয়োগ থেকে রা করা। আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে গ্রামীণ সাধারণ বন ব্যবহার হলে দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না;

৪.         সমষ্টিগত মালিকানাধীন বন ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত হেডম্যান ও কার্বারিদের কর্তৃত্বের সঙ্গে বন ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলা;

৫.         প্রাকৃতিক বন রা ও বন সম্প্রসারণের নামে সরকারি অধিগ্রহণ থেকে গ্রামীণ সাধারণ বনকে আওতামুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা।

শেষ কথা ঃ

গ্রামীণ সাধারণ বন সংরণের মাধ্যমে পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনেকাংশে মোকাবেলা করা সম্ভব। তবে এ কাজটি কোনক্রমেই সহজ নয়। একক কোনো সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, এমনকি সরকারের পওে কঠিন। এ ব্যাপারে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ, সাধারণ জনগণের সচেতনতা ও কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

এই বিভাগের আরো পোস্ট

Tags: