font-help

এই পোস্টটি 1,418 বার দেখা হয়েছে

আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শির গাথুঁনি কবে শুরু হবে? ইলিরা দেওয়ান

ইলিরা দেওয়ান

আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শির গাথুঁনি কবে শুরু হবে?

 

 

ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। খালামনি আর পুতুল চাকমা দুজনে একটি হারিকেন নিয়ে সন্ধ্যায় এক টেবিলে পড়তে বসেছে। খালামনি কলেজে পড়ে আর পুতুল সবে কাশ ওয়ানে। পড়ার ফাঁকে পুতুল হঠাৎ খালামনির কাছে তার বইগুলো চাইলো। তখন খালামনি তাকে জিজ্ঞেস করলো কয়টা বই লাগবে। একটা? না। দুইটা? না। তবে কয়টা? উত্তরে পুতুল বললো ‘বেগগুলি’ অর্থাৎ সবগুলো। ‘বেগগুলি’র মতো জীবনের নিত্য ব্যবহার্য এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের েেত্র শিশুরা স্কুলে গিয়ে শুরুতেই হোঁচট খায়। সেখানে তাদের শতভাগ বাংলা শব্দ-বাক্য মুখস্থ করতে হয়। কাশে যখন পড়ানো হয় তখন শিশুরা উচ্চস্বরে শিককে অনুকরণ করে থাকে, এভাবেই তাদের প্রাথমিক শির হাতেখড়ি হয় শুধুই বাংলা ভাষার মাধ্যমে। পরিবারে স:স্তস্ফূর্তভাবে শিখে আসা শব্দভান্ডার শিশুটির কোনো কাজে আসে না। সে স্কুলে নিজেকে অসহায় ভাবতে শুরু করে। ছোটখাটো দুচারটা জরুরি প্রয়োজনের কথাও সে বাংলা ভাষায় বলতে পারে না। সে প্রশ্ন করতে পারে না। কিন্তু পুতুলের মাতৃভাষা অর্থাৎ চাকমা ভাষায় হলে তার পে অনেক প্রশ্নই করা সম্ভব হতো। ফলে তার শি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মুখস্থ ছাড়া তার অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।

 

ভাষা হল ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিশুরা তাদের কোমলমতি মনে মেধার বীজ বপন করে। কিন্তু আদিবাসী শিশুরা বহু কষ্টে বাংলা বলার পরও তাদের মূল ভাবটা কিন্তু মাতৃভাষায় প্রকাশ করে থাকে। কাজেই শিশুরা যদি মাতৃভাষায় (নিজের ভাষা) ভাব প্রকাশ কিংবা শি গ্রহণের অধিকার পেতো তাহলে তারা অনেক বেশী আগ্রহী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে বেড়ে উঠতে পারত।

 

শিশুর মেধাকে বিকশিত করতে হলে সবার আগে মাতৃভাষার মাধ্যমে শির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। মাতৃভাষায় শি লাভ প্রত্যেক শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ শুধু ভাষাগত সমস্যার কারণে আদিবাসী শিশুদের অধিকাংশই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে যায়। তাই ভাষার দুরত্ব কমিয়ে এনে সকল আদিবাসী শিশুদের শি নিশ্চিত করতে শিবিভাগসহ সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে স্থানীয় শিক নিয়োগের পাশাপাশি অন্য ভাষাভাষী শিকদের স্থানীয় আদিবাসী ভাষার উপর ওরিয়েন্টেশন কোর্সের ব্যবস্থা করা দরকার। যাতে তারাও স্থানীয় মাতৃভাষার মাধ্যমে কোমলমতি শিশুদের ন্যূনতম পাঠদান দিতে পারেন।

পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে, এদেশের ুদ্র জাতিসত্ত্বাদের ভাষা সংরণ ও উন্নয়নের জন্য সরকার আজও কোন পদপে নেয়নি। তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার ও বিরিশিরিতে অবস্থিত উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটগুলো ‘শোকেস’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রাঙামাটিতে কিছু গবেষণাধর্মী কাজ হলেও অন্যগুলোতে তেমন কোনো কার্যক্রম ল করা যায় না। কেবল স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসে প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে নেচে গেয়ে যাওয়া এবং কোনো বিদেশী মেহমানের বিনোদনের খোরাক যোগানোর জন্যই যেন এই প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

 

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগ, আধুনিক ভাষা ইনিস্টিটিউটের কথা জানি। ভাষাতত্ব বিভাগে ুদ্র জাতিসত্তাদের ভাষা সর্ম্পকিত কোনো পাঠ্যসুচী আছে বলে শুনিনি। অন্যদিকে আধুনিক ভাষা ইনিস্টিটিউট সম্পূর্ন বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। এখানে বিদেশীদের জন্য বাংলা এবং স্বদেশীদের জন্য ইংরেজী, জাপানিজ, কোরিয়ান, ফ্রেঞ্চ সহ অন্য অনেক দেশের ভাষা শেখানো হয়। আমি  বিদেশী ভাষা শেখার বিষয়টির সাথে দ্বিমত পোষণ করছি না। তবে এখানে প্রশ্ন জাগে, আমরা বিভিন্ন দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি যতটা আগ্রহ ও উচ্ছাস প্রকাশ করি অথচ নিজের দেশের ভেতরে বিভিন্ন ুদ্র জাতিসত্ত্বাদের ভাষাগুলোকে সংরণ বা উন্নয়নে ঠিক ততটা অনাগ্রহী কেন?

 

মাতৃভাষার লড়াইয়ের জন্য বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু দেশের ভেতরে অনেক ভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে শুধুমাত্র সংরণের অভাবে এবং প্রতাপশালী বাংলা ভাষার সর্বত্র প্রচলনের জন্য। অনেক ভাষার হয়তো হরফ নেই কিন্তু যেসব ভাষার হরফ রয়েছে সেগুলো অতিসত্ত্বর সংরণ করা জরুরি। আর যে ভাষার হরফ নেই সেেেত্র বিকল্প কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে এ বিষয়ে দ্রুত পদপে নেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিদানের জন্য কিছু এনজিও কাজ করছে। তবে এর স্থায়ীত্ব ও ব্যাপকতার জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনিস্টিটিউট গড়ার চিন্তা করি, অথচ নিজের দেশের হারিয়ে যেতে বসা ভাষাগুলোকে সংরণের জন্য কোনো উদ্যোগ নিতে দেখি না। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশে প্রস্তাবিত শিনীতিতে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত শিনীতিটি বাস্তবায়নে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। এছাড়াও সরকার স্বীকৃত আইএলও সনদ, আর্ন্তজাতিক শিশু অধিকার সনদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনে ুদ্র জাতিসত্ত্বাদের প্রাথমিক শিয় মাতৃভাষা প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও  আজ পর্যন্ত কোনো আইনই বাস্তবায়িত হয়নি।

উল্লেখ্য যে, আদিবাসীদের কিন্তু বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। যেমন, চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৭-১৭৮৭) যেটি ‘কার্পাস বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। চাকমা রানী কালিন্দী  তার শাসনামলের পুরোটাই বৃটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন (১৮৪৪-১৮৭৩)। এছাড়া সাঁওতাল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনে আদিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কারোর অজানা নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এ ইতিবাচক ইতিহাসসমূহ জাতির সামনে তুলে না ধরে আদিবাসীরা কী খায়, কী পরে ইত্যাদি বিষয়াদি শিশুদের পাঠ্য বইয়ে অর্ন্তভূক্ত করে শৈশব থেকেই শিশুদের মনে আদিবাসী বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করা হয়।

 

বর্তমান নির্বাচিত মহাজোট সরকারের কাছে সবার প্রত্যাশা অনেক। তদ্রুপ স্বাধীনতার ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও ুদ্র জাতিসত্তাগুলো এখনও প্রত্যাশা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বর্তমান সরকারের আমলে তাদের প্রাণের দাবী ‘আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি’ মিলবে। একইসাথে   স্ব স্ব ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে ভাষাগুলো সংরণের উদ্যোগ নেয়া হবে এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে আদিবাসী শিক নিয়োগের মাধ্যমে শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শি নিশ্চিত করা হবে।

 

সবশেষে এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে, প্রাথমিক শিয় মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। মাতৃভাষায় অধ্যয়ন করলে একটি শিশু যেমন দ্রুত মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে, তেমনী সে অনেক বেশী আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে বেড়ে ওঠে। তাইতো এ উপলব্দি থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছেন, ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজী শেখার পত্তন।’

 

আমাদের দেশের সব ুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষজন ‘মাতৃভাষার গাঁথুনি’র অপোয় আছে।

এই বিভাগের আরো পোস্ট

Tags: