font-help

এই পোস্টটি 810 বার দেখা হয়েছে

উত্তর জনপদের আদিবাসীদের বর্ষবরণ। কুমার প্রীতীশ বল

উত্তর জনপদের আদিবাসীদের বর্ষবরণ। কুমার প্রীতীশ বল

১. প্রাককথন

নববর্ষ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের স্মরণে আসে পহেলা বৈশাখের কথা। পহেলা বৈশাখে নব আনন্দে নব উৎসবে আমরা মেতে উঠি। এখানে আমরা বলতে পাঠক বুঝে নিবেন অতি অবশ্যই বাঙালির বাংলা নববর্ষের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নামের জনপদটিতে বহু জাতিসত্তার বহু ভাষাভাষি মানুষের বসবাস। বাঙালি ছাড়াও এখানে আরও ৪৫টি জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে, যাদের জীবনাচারের সাথে আমাদের অর্থাৎ বাঙালিদের কোনো মিল নেই। কিন্তু এই দেশটি নির্মানে এবং ভবিষ্যতের পানে এগিয়ে যাওয়ার েেত্র তাদের অবদান অসীম। তাই বহুজাতিক এই জনপদের মানুষের নববর্ষ বলতে শুধু একটি বিশেষ দিনে একটি বিশেষ রীতি বা কৃষ্টিকে মনে করা উচিত হবে না।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা বর্ষবিদায় এবং নববর্ষকে বৈসাবি উৎসব নামে পালন করে। আসলে বৈসাবি নামে তাদের কোনো উৎসব নেই। এখানে ত্রিপুরা জাতিসত্তার বৈসুক উৎসব,  মারমা জাতিসত্তার সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার বিঝু বা বিষু উৎসবের প্রথম তিন অর নিয়ে বৈসাবি উৎসব নামকরণ করা হয়। বৈসাবিকে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নববর্ষের পোষাকি নাম। কিন্ত এবার ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ঐতিয্যবাহী উৎসব বৈসাবি’র নাম পরিবর্তন করে বিজু নামে পালনের নির্দেশ দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। …পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণচন্দ্র চাকমা স্বারিতএকটি চিঠিতে সরকারি পরিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ৯৩ সালের আ্যাক্ট অনুয়ায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার উপজাতীয়দের জাতীয় সামাজিক উৎসব বিজু উপলে প্রতিবছর ৩০ চৈত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্থানীয় ছুটি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আজকাল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও বিজ্ঞাপনে এ উৎসবকে বিজুর পরিবর্তে বৈসাবি বলা হচ্ছে। প্রকৃতপে বৈসাবি নামে কোনো শব্দ উপজাতীয় ভাষায় নেই। ৯ মার্চ স্বারিত এ পত্রটি তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলাপ্রশাসক, বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটকে দেয়া হয়েছে।’ (আমাদের সময়, ৪ এপ্রিল ২০০৮)।

 

মিডিয়ার কল্যানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈসাবি (এখানে এখনও বৈসাবি উল্লেখ করার কারণ এই চিঠির প্রেেিত পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি) উৎসব দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বাংলাদেশের বিশাল জনপদ জুড়ে (চলতি কথায় এদের সমতলের আদিবাসী বলা হয়।) বিশেষ করে উত্তর জনপদে আরও যে সব আদিবাসী আছে,  তাদের বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ সম্পর্কে সাধারণের তেমন ধারণা নেই। তাই এখানে হাজং, সাঁওতাল এবং ওরাঁও জাতিসত্তার লোকসকলের বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হলো।

 

২. হাজং জাতিসত্তা

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা জেলায় হাজং জাতিসত্তার লোকসকল বসবাস করে। এছাড়াও  বৃহত্তর সিলেট জেলায়ও কিছু হাজং জাতিসত্তার লোক আছে।

 

হাজং জাতি সত্তার ঐতিয্যবাহী একটি উৎসবের নাম হলো হঙ্গরাণী। হাজং জাতিসত্তার লোকসকল বর্ষ বিদায় এবং বর্ষবরণ উপলে এই হঙ্গরাণী উৎসবের আয়োজন করে। হঙ্গরাণী উৎসব বর্ষবিদায়ের দিন শুরু হয়। এই উৎসব ২/৩দিন ধরে চলে। হঙ্গরাণী উৎসবের সূত্রপাত হয় ঘর-বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে। এ সময়  একে একে ঘরের আসবাবপত্র, থালা-বাসন, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি ধুয়ে মুছে সাফ করা হয়। সেদিন হাজং জাতিসত্তার লোকসকল  স্নান করে আগামী বছর যেন মানুষের জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে  ওঠে। বাড়িতে বাড়িতে হঙ্গরাণী উৎসবের সময়ে পিঠা-পায়েস রান্না হয়। প্রার্থনা শেষে এই পিঠা-পায়েস খাওয়ার ধুম পড়ে। সন্ধ্যায় দেখা যায় অন্যপরিবেশ।্ তখন বাড়ির চারিদিকে  জ্বালানো হয় মঙ্গলপ্রদীপ। এতে কোনো অপশক্তি বাড়িতে আসতে পারে না। মঙ্গলপ্রদীপগুলোর মধ্যে একটিকে উপরে, অন্যগুলো ক্রমান্বয়ে নিচে সজ্জিত হয়। এসব প্রদীপ এক সপ্তাহ থাকে। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন আর বেশিদিন সংরতি হয় না। মাত্র দু-তিন দিন থাকে। হঙ্গরাণী উৎসবের সময়ে হাজং জাতিসত্তার লোকসকল একশত সাত প্রকারের শাকসবজি দিয়ে তরকারি রান্না করে। এই তরকারিকে তারা মহৌষধ মনে করে। হাজং জাতিসত্তার লোকসকল মনে করে এতে শরীরের ব্যাথা-বেদনা কেটে যায়। অনাগত বছরে রোগ-ব্যাধি আক্রমণ করে না।

 

৩. সাঁওতাল জাতিসত্তা

বাংলাদেশে সাঁওতাল জাতিসত্তার লোকসকল দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগজ্ঞ, রংপুর, পঞ্চগড়, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট জেলায় বসবাস করে। এছাড়া বৃহত্তর সিলেটের চা বাগানেও কিছু সাঁওতাল জাতিসত্তার লোক বসবাস করে।

 

সাঁওতাল জাতিসত্তার লোকসকল ফালগুন মাস থেকে বর্ষ গণনা শুরু করে। নববর্ষকে বরণ করার জন্য সাঁওতাল জাতিসত্তার লোকসকল বাহা পরব বা পুল উৎসব পালন করে। বাহা শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ফুল। বাহা পরব পালিত হয় ফালগুন মাসের পূর্ণিমাতে।  মানঝির (গ্রাম প্রধান) সঙ্গে পরামর্শ করে বাহা পরবের দিন ঠিক করা হয়। এই উৎসব চলে দুই দিনব্যাপী। কখনো কখনো তিন থেকে চারদিন চলে। বাহা পরবের জন্য নির্ধারিত স্থানকে বলা হয় ‘জাহের থান’ বা ‘জাহের বির’। বনের ভিতরে বাহা পরবের মণ্ডপ তৈরি হয়।

 

বাহা পরবের প্রথম দিনকে বলে বাহাউম। এদিন জগ-মাঝি ( সহকারি গ্রাম প্রধান) যুবকদের নিয়ে বনে যায়। সেখানে তিনটি ছোট ছোট খড়ের ঘর তৈরি করেন। নাইকে (পুরোহিত) কাঁসার থালায় গোবর ও সিঁদুরের কৌটা নিয়ে জাহের থানে যান। নাইকে গোবর দিয়ে ঘর তিনটির চারিদিক লেপন করে বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর কুডাম নাইকে (সহকারি নাইকে) পাড়ার জগ-মাঝিসহ সবাইকে নিয়ে শিকারে যান। যাত্রা পথে কোনো এক চৌরাস্তায় বনদেবতার পূজা করেন। শিকার শেষে সবাই নাইকের বাড়িতে আসে। তাদের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রও থাকে। নাইকে নির্দেশ দিলে টামাক (নাকাড়া) বাজাতে থাকে।এই বাজনার তালে তালে গান হয়। পুরুষরা সমবেত কষ্ঠে গান গাইতে গাইতে বাহা রোঙ্গাকে (ফুল দেবতা) ডাকে। তখন সাঁওতাল জনপেেদর তিনজন যুবক অস্থির ও উত্তেজিতভাবে মাথা দোলায় এবং লম্ফ-ঝম্ফ করে। এ সময় শিঙ্গা বাজানো হয়। সাঁওতালী ভাষায় দেবতাদের নামানুসারে এই তিন যুবকের তিনটি আছে। প্রথম যুবককে  জাহের এঁরা, দ্বিতীয় যুবককে মারাংবুরু এবং তৃতীয় যুবককে পারাগানা বোঙ্গা বলে। ধারণা করা হয়, এই তিন যুবকের উপর দেবতা তিনজন ভর করেছে। দেবতা ভর করাকে বলা হয়, রুম।

 

জাহের এঁরা ফুলের দেবী। মারাংবরু পাহাড়ের দেবতা। তিনি দেবতাদের মধ্যে প্রধান। পারাগানা বোঙ্গা এলাকার দেবতা। এই দেবতাকে সাঁওতাল জাতিসত্তার লোকসকল বাহা বোঙ্গা বল্।ে জাহের এঁরা নাইকের কাছে হাতের বালা চায়। নাইকে তখন তাকে বালা পরিয়ে দেন। মারাংবরু দাবি কওে তীর ধনুক। নাইকে তার হাতে তীর ধনুক দেন। এ সব নিয়ে দেবতা তিনজন জাহের থানে যান। তাদের পিছনে নাইকে, জগ-মানঝি ও অন্যরা টামাক ও শিঙ্গা বাজাতে বাজাতে মণ্ডপে যায়। ঘর তিনটি পারগানা বোঙ্গা ঝাড়– দেয়, জাহের এঁরা লেপন করে, মারাংবোরু তীর ধনুক  নিয়ে পাহারায় থাকে। এরপর নাইকে দেবতাদেও বাড়িতে এনে পাটিতে বসিয়ে জানতে চান, এ বৎসর বৃষ্টি কেমন হবে? রোগব্যাধি বা মহামারি হবে কিনা? ঐ তিন দেবতা এ সব প্রশ্নের জবাব দেয়। এদের পরামর্শ অনুযায়ী সাঁওতাল জাতিসত্তার লোকসকল পরবর্তীকালে চলে। এ সময় উপস্থিত সকলে দেবতার উদ্দেশ্যে নাচ-গান করে। নাইকে সবাইকে মদ দিয়ে আপ্যায়ন করে। বাহা পরবে যে নৃত্য করে তার নাম বাহা এঁনেচ বা ফুলের নাচ। আর যে গান করে তার নাম বাহা সেরিং বা ফুলের গান। এ গানের কয়েকটি পংক্তি হলো :

কার জন্য এই বালা তৈরি হলো?

কার জন্য এই হাতের আংটি তৈরি হলো?

ফলের দেবীর জন্য হাতের বালা তৈরি হলো।

সেই দেবীর জন্যই হাতের আংটি তৈরি হলো।

অনেক যুবক- যুক্ষতী দল বেধে হাতে হাত ধরে নাচে আর একজন বয়স্ক পুরুষ গান করে। নাইকের বাড়িতে রাতব্যাপী নৃত্য-গীত চলে। একে বলা হয় নাইকে জাগরণ।

দ্বিতীয় দিন সকালে একই ভাবে আবার অনুষ্ঠান শুরু হয়। নাইকে সমবেত সাঁওতাল জাতিসত্তার লোকসকলকে জাহের থানে যাওয়ার জন্য আহবান জানান। নাইকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করে তিন দেবতা ও একজন অবিবাহিত যুবককে নিয়ে জাহের যান। অবিবাহিত যুবকটি সারাদিন উপোস করে। নাইকে নিজেও উপোস থাকেন। আগের মতোই মিছিলে যুবক-যুবতীরা নৃত্য-গীত করে, নাকাড়া বাজায়, শিঙ্গা ফুকায়। নাইকে ঘর তিনটা আবার লেপন করেন। তিনি অবিবাহিত যুবকটিকে নতুন মাটির কলসিতে পুকুর বা নদী থেকে পানি আনতে বলেন। নাইকে মণ্ডপের তিন কোণে তিনটা তীর সুতা দিয়ে পেচিয়ে পুঁতে ফুল দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা করেন।

 

পূজা শেষ হলে অবিবাহিত যুবতীরা দুজন করে ফুল নেবার জন্য নাইকের কাছে যায়। যুবতীদের গায়ে পানি ছিটিয়ে আঁচলে ফুল দেন। তখন যুবতীদ্বয় যোহার যোহার বলে নমষ্কার করে। নাইকে হাত তুলে তাদের আর্শীবাদ করেন। যুবতীরা আঁচলের ফুল মাথায় গুঁজে আবার নাচে। তারপর দুজন অবিবাহিত যুবক একইভাবে ফুল ও আর্শীবাদ গ্রহণ করে। এভাবে সাঁওতাল জাতিসত্তা লোকসকল গায়, তার নাম ‘বাহা কয় সেরঞ’ অর্থাৎ ফুল চেয়ে নেওয়ার গান।

এ সময়ে সাঁওতাল জাতিসত্তার নারীসকল গান করে;

বোন আমি ফুল চাইতে গেলাম,

বোন আমি পাঁচটা শালফুল পেলাম।

সাঁওতাল জাতিসত্তার পুরুষ সকল গান করে;

বোন আমি ফুল চাইতে গেলাম

বোন আমি ছয়টা শালফুল পেলাম।

সবাই নাচতে গাইতে গাইতে আবার নাইকের বাড়ি আসে। নাইকের স্ত্রী সবাইকে মদ্য পান করান। মদ খেয়ে সবাই বাড়ি ফিরে যায়। ফুলের ডালা আর তীর ধনুক নিয়ে নাইকে এবং অবিবাহিত যুবকটি পানি ভর্তি কলসীটি নিয়ে অন্য বাড়ি যায়। ঐ বাড়ির যুবতীরা তাঁদের পা ধুয়ে সরিষার তেল মালিশ করে। নাইকে সেই যুবতীটিকে ফুল দেন। অবিবাহিত যুবকটি কাঁধের কলসী থেকে যুবতীর পিঠে পানি ঢালে। এভাবে বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাইকে ফুল বিতরণ করে এবং যুবকটি পানি ঢালে। প্রত্যেক বাড়িতে নাইকে এবং যুবকটি এক বাটি মদ্য পান করেন। নাইকে যুবকটিকে নিজের বাড়িতে এনে আবার খেতে দেন। এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় হোলি খেলা। কখনো কখনো সারাদিন-সারারাত এমনকী পরের দিন দুপুরেও এই হোলি খেলা চলে।

 

৪. ওঁরাও জাতিসত্তা

ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকল রাজশাহী, দিনাজপুর, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগজ্ঞ, রংপুর,পঞ্চগড়, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, পাবনা জেলায় বসবাস করে। ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকল বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের নাম ফাগুয়া। ফাগুয়া ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকলের জাতীয় উৎসব। ফাগুয়া শব্দটি তুর্কী শব্দ ফাগ থেকে এসেছে। ফাগ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আবীর। ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকল উৎসবটি উদযাপন  করে ফাল্গুনী পূর্ণিমায়। তাতে প্রচুর আবীর ব্যবহৃত হয়। ফাল্গনী পূর্ণিমায় পাহান বা পুরোহিত অফুলন্ত শিমুল গাছের একটি, ভেরেণ্ডা গাছের একটি এবং জিগা গাছের একটি শাখা কেটে গ্রামের বাইরে পূজার জন্য নির্ধারিত থানে পুতে রাখে। একটু দূরে দূরে শাখা তিনটির গায়ে হেলান দিয়ে রাখে। কিছু খড় বিছিয়ে একটি ডালের নিচে রাখেন। এ সময় ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকল খোল-করতাল-বাঁশী বাজাতে বাজাতে সেখানে উপস্থিত হয়।

 

পূজার শুরুতে পুরোহিত একটি শাখা হাতে নিয়ে ডান দিক থেকে তিনবার থান ঘুরে দণি দিকে মুখ করে খড়ের আঁটিতে আগুন দেন। সে সময় উপস্থিত ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকল সমস্বরে বলে উঠে, নববর্ষের সকল অকল্যাণ, রোগ-শোক-দুঃখ-যন্ত্রণা দূর হোক। আগুন নেভার আগেই পুরোহিত বা তার সহকারি শাখা তিনটির গোড়া পরিষ্কার করে ধারালো দা দিয়ে এক কোপে দু’টুকরো করে– প্রথম অংশ নিজের কাছে রাখে এবং অপর অংশ অন্যত্র পূঁতে রাখেন। এ অংশটি শিশু-কিশোররা গ্রামের বাইরে নিয়ে পথের পাশে রাখে। এরপর উপস্থিত লোকসকল আগুনের ছাই কপালে, নাভিতে ঘষে সারা বছর রোগ-শোক থেকে মুক্ত রাখতে দেবতার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে। এ সময় শিশু-কিশোররা ছোট ছোট কাপড়ের পুটলীতে কেরোসিন তেল মেখে আগুন ধরিয়ে আনন্দ-কোলাহলে মেতে ওঠে। ফাগুয়াতে দুটো অনুষ্ঠান হয়। প্রথম অনুষ্ঠানে গৃহদেবতার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে মদ্য পান করে নববর্ষকে আহবান করা হয়। ফাগুয়াতে মদের সঙ্গে থাকে পিঠা।এই পূজার জন্য পুরোহিত প্রয়োজন হয় না। গৃহকর্তা অথবা পরিবারের অভিজ্ঞ যে কোনো ব্যক্তি এই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এই পূজাটির নাম মিপ্তোঃ কিতো। এই পূজার জন্যে ঘরের একটি কোণ লেপন করে থান তৈরি করা হয়। গৃহকর্তা অথবা পরিবারের কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি একটি কুলাতে তিনটি কাঁঠাল পাতা রাখেন। এর ওপর তিন টুকরো পিঠা দেন। গৃহকর্তা করজোড়ে  গৃহদেবতার কাছে পূর্বপুরুষের আত্মার কল্যান কামনা করেন। তারপর পিঠার ওপর প্রথমে পানি, পরে মদ উৎসর্গ করেন। পূজা শেষে তিনি মদটুকু পান করেন অথবা পরিবারের অন্য একজনকে খেতে বলবেন। এই পূজার মদ নারীরা খেতে  পারে না। পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মদ অথবা পিঠা খাওয়া নিষেধ।

 

ফাগুয়া উৎসবের উল্লেখযোগ্য দিক শিকারযাত্রা। ফাগুয়ার তিনদিন আগে  প্রতিটি গ্রাম থেকে দশ-পনের জন যুবক একত্রে শিকারে যায়। শিকার যাত্রা সফল হওয়ার জন্য এর আগে ডাণ্ডা কাট্টা পূজা করেন গ্রামের বিশেষ একজন পুরোহিত। একদিন আগে ঐ পুরোহিতকে জানাতে হয়। পুরোহিতকে এ জন্য বিশেষ আচার মানতে হয়। অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকে পুরোহিত পানি ছাড়া অন্য কিছু খেতে পারেন না। পুরোহিতের পরিধানে থাকে গেজ্ঞি ও ধুতি। এই পূজার জন্য প্রয়োজন হয় এক কলস মদ, একটি কুলো, আতপ চাউল, একটি মুরগীর ডিম, ধূপ, সিদুঁর এবং তিনটি কাঁঠাল পাতা। এই অনুষ্ঠানটিও ঘরের ভিতরে হয়। পূজাতে ডিম একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসাবে বিবেচিত। পূজার আগে পুরোহিত একটি বাঁশের মাথায় ডিমটি রেখে তা থানের সামনে রাখেন। পূজা শেষে ঘটিতে রাখা মদ পুরোহিত পান করেন। এই সময় ডিমটি ভেঙে একটা বড় চামচে সামান্য আতপ চাউল মিশিয়ে আগুনে গরম করা হয়। মদ পানের সময় গ্রামের বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সেই ডিম মিশ্রিত আতপ চাউল খেতে দেয়। কখনো তা শিশু-কিশোরদেরও দেওয়া হয়।

 

শিকারীরা ফিরে আসে ফাগুয়ার আগের দিন। শিকারে পশু-পাখি মেরে কিছু মাংস নিজেরা খায়, কিছু শুকিয়ে শিকেয় গেঁথে নিয়ে আসে। সে সব মাংস গ্রাম্য বিধি মোতাবেক গ্রামের লোকসকলের মধ্যে বিতরণ করা হয়, কিছু মাংস শিকারীরা ঘরে নিয়ে যায়। গ্রামবাসীদের মধ্যে বন্টনকৃত মাংস ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকল একত্রে রান্না করে খায়। এ সময় নৃত্য-গীতও চলতে থাকে।

 

ফাগুয়া উৎসবের নৃত্য-গীত দারিদ্র পীড়িত ওঁরাও জাতিসত্তার লোকসকলের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছলতার সৃষ্টি করে, দুঃখ-বেদনা ভুলে যায়। এ সময়ে গীত সংগীতের কয়েকটি পঙক্তি হলো;

সারহুলের চন্দ্রোদয়ে হৃদয় নৃত্য করছে,

ফাগুয়ার চন্দ্রোদয়ে হৃদয় নৃত্য করছে,

পূর্ণিমার চন্দ্রোদয়ে হৃদয় নৃত্য করছে,

চন্দ্রের ীয়মানতায় হৃদয় ব্যথাহত হচ্ছে,

নববধুর আগমনে হৃদয় নৃত্য করছে,

দেবর দর্শনে বধুর হৃদয় নৃত্য করছে,

পূর্ণিমার চন্দ্রোদয়ে হৃদয় নৃত্য করছে,

পূর্ণিমার ীয়মানতায় হৃদয় ব্যথাহত হচ্ছে।

 

৫. শেষকথা

আদিবাসী লোকসকলের ঐতিয্যবাহী বর্ষবরণ এবং বর্ষবিদায়ের অনুষ্ঠান আদিকাল থেকেই সর্বজনীন। আদিবাসী লোকসকলের অংশগ্রহনে এই সর্বজনীন লৌকিক চৈতন্য বিকশিত হয়। এখানে ব্যক্তির কোনো প্রাধান্য প্রকাশ পায় না। এর ফলে আদিবাসী লোকসকল আর একবার একতার বন্ধনে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ হয়। এেেত্র বাঙালি এই সর্বজনীন লৌকিক শিল্প চৈতন্যের সাথে কোনো প্রকার সাদৃশ্য খুঁজে পেলে আমরাওূ হতে পারি একটি প্রাচীন সাংস্কৃতিক চেতনাবোধের অংশীদার।

 

কৃতজ্ঞতা

১. আখতার উদ্দিন : বাংলাদেশের সাঁওতাল সমাজ

২. ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল : উত্তরবঙ্গের আদিবাসী লোকজীবন ও লোকসাহিত্য ওঁরাও

৩. জাফার আহমদ হানাফী : উপজাতীয় নন্দন সংস্কৃতি

৪. সজ্ঞীব দ্রং : বাংলাদেশের বিপন্ন আদিবাসী

৫. সমর সিংহ হাজং

৬. দৈনিক আমাদের সময়, ৪ এপ্রিল ২০০৮

 

বিদ্রঃ- এই লেখাটি ২০১০ ইং সালে বনযোগীছড়া কিশোর কিশোরী কল্যাণ সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত স্ববন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

এই বিভাগের আরো পোস্ট

Tags: