font-help

এই পোস্টটি 1,364 বার দেখা হয়েছে

প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে আদিবাসী ভাষা-শিক্ষা কার্যক্রমের একটি নিকট মূল্যায়ন প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম।

প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে আদিবাসী ভাষা-শিক্ষা কার্যক্রমের একটি নিকট মূল্যায়ন প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিজ্ঞান্তর তালুকদার

ভূমিকাঃ

বাংলাদেশের দণি-পূর্বাংশে প্রায় এক দশমাংশ জায়গা  জুড়ে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। মূলতঃ রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি এই তিন পার্বত্য জেলার সমন্বয়ে  এ অঞ্চলের  অবস্থান। দশ ভিন্ন ভাষা-ভাষী এগারটি আদিবাসী পাহাড়ী জাতিসত্বার অনন্য সমাবেশ এবং প্রাকৃতিক নৈসর্গের অপূর্ব সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এ অঞ্চল। এসব জাতিগোষ্ঠীর অনেকেরই রয়েছে নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং স্বকীয় জীবনধারা। ভূ-প্রকৃতিগতভাবে এ অঞ্চল যেমনি ভিন্ন তেমনি নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যেও এ অঞ্চল অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ। এখানকার  সমাজ, সভ্যতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি বাংলাদেশের অপরাপর সমতল এলাকার চাইতে অনেক অনেক ভিন্নতর। সব মিলিয়ে এ অঞ্চল ভৌগলিক অবস্থা ও অবস্থানগত কারণে স্মরণাতীতকাল থেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে এক আলোচিত ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহণকরে আসছে। বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য-সংস্কৃতির এই আদিবাসীরা বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তুলনায় নানা দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা’ এর মধ্যে অন্যতম।

ঐতিহাসিক প্রোপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিার অগ্রযাত্রা ঃ

ব্রিটিশ আমলে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে “রেইড অব ফ্রন্টিয়ার ট্রাইবস্ অ্যাক্ট, অনুসারে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট তারিখে চট্টগ্রাম জেলা থেকে পৃথক হয়ে “পার্বত্য চট্টগ্রাম” নামে পৃথক একটি জেলার সৃষ্টি হয়। প্রথম দিকে নবসৃষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার প্রধান কার্যালয় চন্দ্রঘোনায় এবং পরে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে রাঙামাটি শহরে (পুরাতন রাঙামাটি) স্থানান্তর করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টির পরও এ অঞ্চলে প্রায় একশ বছর পর্যন্ত শিার উন্নয়নে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। সে’ থেকে বর্তমান সময় অবধি বিভিন্ন পট পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পার হলেও একশ বছরের পশ্চাৎপদতা শিা উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখনও পিছু টানছে।

সমাজ-সভ্যতার উন্নয়নে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত প্রতিটি েেত্র ক্রমবিবর্তনের একটি ধারা চলে আসছে আদি যুগ থেকে। শিা এর মধ্যে অন্যতম ত্রে। অথচ দিগন্ত বি¯তৃত নীলাকাশের চাঁদোয়ায় গভীর অরণ্যে আচ্ছাদিত উঁচু-নিচু অসংখ্য পাহাড় তথা পার্বত্য উপত্যকায় স্মরণাতীতকাল অবধি বসবাসরত ভিন্ন ভাষা-ভাষী আদিবাসী পাহাড়ী জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় শিার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে অর্থাৎ ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শুরু থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাঙামাটি। সে কারণে হয়তো ন্যূনতম হলেও আধুনিক শিা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল রাঙামাটিকে কেন্দ্র করেই।

এ অঞ্চলে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন সূচিত হয় মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেসিক আমলে। তবে প্রথম দিকে তখন এ পরিবর্তন সীমিত ছিল। ‘‘আধুনিকায়ন এবং শিল্পায়নের প্রভাবে এ ধরনের পরিবর্তন পরবর্তী পর্যায়ে জাতীয় অস্তিত্ব সংরণ ও চেতনা বিকাশে রূপ নেয়’’।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রকাশনা গ্রন্থ পর্যালোচনা করে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমগ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠী সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিার সুযোগ পেতে শুরু করে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ থেকে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে। সূচিত এ অগ্রযাত্রায় “চন্দ্রঘোনা বোর্ডিং স্কুল” নামে এ বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয় জেলার অস্থায়ী সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনায়।

পরে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে জেলা সদর চন্দ্রঘোনা থেকে স্থানান্তরের ফলে “রাঙামাটি গভর্ন্মেন্ট বোর্ডিং স্কুল” নামকরণ করে স্কুলটি রাঙামাটিতে স্থানান্তর করা হয়। তখনকার সময়ে “রাঙামাটি গভর্ন্মেন্ট বোর্ডিং স্কুলে” “বাংলা” এবং “ইংরেজি” শিা ছাড়াও “চাকমা” ও “মারমা” ভাষা শেখানো হতো। এবং এ স্কুলে ছাত্রদের লেখাপড়া, বই-পুস্তক ও থাকা-খাওয়ার সকল ব্যয়ভার বহণ করা হতো সরকারিভাবে। তবে তৎপরবর্তীকালে ‘চাকমা ও মারমা’ ভাষা শেখানো হয়েছে কিনা আমার জানা নেই! এরপর ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে স্কুলটি “এম.ই.স্কুল” এবং ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে উন্নীত করা হয়। এটিই বর্তমানে “রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়” নামে স্থায়ীত্ব লাভ করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম স্কুলটি প্রতিষ্ঠার ৪১ বছরের ব্যবধানে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় স্কুলটি স্থাপিত হয় মাওরুম (বর্তমান নাম মহাপ্র“ম) নামক স্থানে।

পরে আবার ৬১ বছরের ব্যবধানে তৃতীয় স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয় রামগড় মহকুমায়, যা উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে দ্বিতীয় স্কুল। এ ছাড়াও তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে শিা উন্নয়নে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে “ওহংঢ়বপঃড়ৎ ড়ভ ঝপযড়ড়ষং নামে একটি আলাদা শিা বোর্ড গঠনের মাধ্যমে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়”। কমিটির সহায়তায় সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে মাওরুম, দিঘীনালা, মগবান, সুভলং (আদি নাম ‘শলক’ বা ‘শলক দুঅর’) প্রভৃতি স্থানে গড়ে উঠে বেশ কিছু শিা প্রতিষ্ঠান। তবে এও দেখা গেছে যে, উক্ত বোর্ড তথা বোর্ড কমিটি গঠনের পূর্বেও বেশ কিছু সংখ্যক দূরদর্শী চিন্তাধারা সম্পন্ন সচেতন ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে শিা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যেমন- বর্তমান রাঙামাটি সদর উপজেলাধীন বন্দুকভাঙা ইউনিয়নের অর্ন্তগত নোয়াদাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি, এটি স্থাপিত হয় ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে। এভাবে বেশ কিছু প্রাথমিক ও নিু মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকতে পারে যা পশ্চাৎপদতা কিংবা বিভিন্ন কারণে নথিভুক্ত করা হয়নি। তখনকার সময় শিা বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগ্রহ ও প্রেরণা জাগাতে আন্তরিকভাবে কাজ করেন। এ অঞ্চলে শিা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী কৃষ্ণ কিশোর চাকমা, ভূবন চন্দ্র চাকমা, নিরোধ চন্দ্র দেওয়ান, কৈলাশ কুকী প্রমূখ ব্যক্তিগণের নামসহ বেশ কিছু সমাজ সচেতন ব্যক্তির নাম বিভিন্ন প্রকাশিত পুস্তকে উলেখ পাওয়া যায়। তখনকার সময়ে পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় শিােেত্রও সাধিত হয়েছে ইতিবাচক পরিবর্তন।

পাকিস্তান শাসন এবং পরবর্তী বাংলাদেশের শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিা ব্যবস্থা ঃ

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে খরস্রোতী কর্ণফুলী নদীর বুকে কাপ্তাই নামক স্থানে বাঁধ দিয়ে বিশাল কাপ্তাই হ্রদের সৃষ্টি। এটি একদিকে প্রাকৃতিক শোভাকে আকর্ষণীয় করেছে ঠিকই কিন্তু তার বিনিময়ে ৩৫৪ বর্গমাইল ব্যাপি এলাকার জনবসতি, ঘর-বাড়ি, কাপ্তাই বাঁধের পূর্ববর্তী বেশ ক’টি শিা প্রতিষ্ঠান, আবাদী জমি চিরতরে হ্রদের অতলে হারিয়ে গেছে! উদ্বাস্তু হয়েছে লাধিক মানুষ। এ সময় শিা বিস্তার ও উন্নয়নে অনেক বিঘœ ঘটে। ফলে পাহাড় অরণ্যের আড়ালে-আবডালে জমে থাকা সমস্যা আরও প্রকটতর হয়। আদিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক েেত্রও সুদূর প্রসারী সুগভীর  চিন্তা, চেতনা এবং ধ্যান-ধারনা, আশা-আকাঙ্কার মর্মবোধ সুদৃঢ় হয়। ফলে শিা গ্রহণ ও প্রসারের বিষয়টি জোরদার হতে থাকে।

পরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান লাভ করে  নতুন একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশ নামের মধ্যদিয়ে। স্বাধীনতাত্তোর আবারও নতুন করে সূচিত হয় দেশের অপরাপর এলাকার ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শিার নবযাত্রা।

পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আশি’র দশকে আবার পার্বত্য চট্টগ্রামকে নতুন করে তিনটি পৃথক জেলায় নামকরণ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলায় উন্নীত করা হয়। পার্বত্যাঞ্চলের আদিবাসী পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠীরাও সময় এবং বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়ে শিার প্রতি গভীর আগ্রহ ও মনোযোগ দিতে থাকে।  এরই মধ্যে অনেকেই শিতি হয়ে বিভিন্ন সরকারি পেশায় নিয়োজিত হতে থাকে। তবে পাকিস্তান এবং ব্রিটিশ শাসনামলেও অনেকেই বিভিন্ন পেশায় চাকরি করতেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সময়ের বিবর্তনের ধারায় পর্যায়ক্রমে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে সচেতন হয়ে পড়ে। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরকাল অতিক্রান্তের পর স্বকীয় ভাষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি তথা নিজস্ব জীবনধারা প্রচার, প্রসার, সংরণ এবং বিকাশের ত্রে আরও সুদৃঢ় হতেই থাকে। আদিবাসীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগ সূচিত হয় নবরূপে।

প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিা গ্রহণের গুরুত্ব ঃ

‘মানব হৃদয়ের একান্ত অনুভূতি ও আত্মপলব্ধি অন্যের নিকট ব্যক্ত করার ব্যাকুলতা থেকেই ভাষার উৎপত্তি’। আর  তাই ভাষা মানব জাতির শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। “জন্মের পর মানুষ যে ভাষায় কথা বলে ও মনের ভাব প্রকাশ করতে শেখে এবং ভাষাজাত সাংস্কৃতিক আবহে সে বড় হয়ে ওঠে তাই মাতৃভাষা”।

ভাষা মানুষের জন্মগত অর্জন। ভাষার মধ্য দিয়ে সভ্যতার অগ্রযাত্রা। ভৌগলিক বৈচিত্র্য মানুষের ভাব আদান-প্রদানে ভিন্নতা তৈরি করেছে, যার পরিপ্রেেিত বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষা পদ্ধতি চালু হয়েছে, এসেছে ভাষাগত বৈচিত্র্য।

“ভাষা মানুষের শুধু আবেগের বাহন নয়। ভাষা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকগতভাবে একটা জাতির টিকে থাকার মাধ্যমও বটে।” ভাষা যেহেতু মানুষের যাবতীয় কর্মকান্ডের সাথে জড়িত, সেহেতু ভাষার পরিমন্ডল অনেক বড়, অনেক বেশি বি¯তৃত। ভাষা সকল মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম বলে ভাষার কোনো শ্রেণী নেই। ভাষা সেই অর্থে শ্রেণী নিরপে। যখন যার শাসন থাকে ভাষা তখন তার হয়েই কাজ করে। জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই ভাষাকে দেখা উচিত, ভাষা সকলের। তাই মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বরণ করে প্রচলন না করলে কোনো জাতি উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে না।

শিশু শিা বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, “মাতৃভাষায় অধ্যয়ন করলে একটা শিশু আত্মবিশ্বাসী ও দ্রুত মেধার কিাশ ঘটাতে সম হয়। অপরদিকে ভিন্ন ভাষায় লেখাপড়া করলে তার পে এক প্রকার মানসিক চাপ ও অসহায়ত্ব সৃষ্টি হয়”। দেখা যায় যে, যখন আদিবাসী শিশুরা স্কুলে গিয়ে অ, আ, ক, খ ইত্যাদি শেখে বা আগডুম, বাগডুম বুলি আউড়াতে থাকে তখন তারা মোটেও বুঝতে পারে না তারা কি শিখছে! ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আদিবাসী শিশুদের ড্রপ-আউট হওয়ার পেছনে এটাও একটা অন্যতম কারণ! অন্যভাবে দেখলে বিষয়টি আরো মারাত্মক। সেটা হলো “যখন কোনো জাতির শিশুরা নিজ মাতৃভাষায় পড়াশুনা করার সুযোগ পায় না তখন তারা ধীরে ধীরে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করার মাধ্যমে নিজস্ব সংস্কৃতিকে ভূলে যেতে বসে”! দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে মাতৃভাষায় পড়াশুনা করার সুযোগ না থাকায় আদিবাসীদের বেলায় এ সত্যটি আজ করুণ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে!

শিাই জাতির মেরুদন্ড। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে শিার গুরুত্ব যেমনি অপরিসীম তেমনি অপরিহার্য। আর তাই প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বপ্রথম সেই শিা হতে হবে নিজ মাতৃভাষায়। প্রয়োগ করতে হবে সেই সব প্রতিষ্ঠানে যেখানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় কিংবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া শিার গুণগতমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই আদিবাসীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিা নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রকেই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হবে।

কোডেক-রাঙামাটি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত সরকারি ও রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের একটি নিবিড় মূল্যায়ন ঃ

বিগত সেপ্টেম্বর ২০১০ ইং মাসের শেষান্তে কোডেক-রাঙামাটি প্রকল্প কর্তৃক পরিচালিত সরকারি ও রেজিঃ প্রাথমিক  বিদ্যালয়সমূহে আদিবাসী ভাষা (চাকমা ও মারমা) শিা কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে উপস্থিত হই বরকল উপজেলার সুভলং ইউনিয়নের অর্ন্তগত মাইসছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমার সঙ্গে কোডেক-এর কয়েকজন কর্মকর্তাও ছিলেন।

সেদিন বিদ্যালয়ের শিক-শিকিাসহ ঐ গ্রামের অভিভাবক ফোরামের সদস্য-সদস্যাদের নিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তাঁদের সাথে প্রাথমিক আলাপচারিতায় জানতে পারি বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জাতীয়করণ করা হয়। ঐ বিদ্যালয়ে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমানে যিনি প্রধান শিক হিসেবে নিয়োজিত আছেন এবং একই সাথে কোডেক কর্তৃক পরিচালিত আদিবাসী ভাষা-শিা কার্যক্রমের আওতায় যিনি ৩য়, চতুর্থ ও ৫ম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে “চাকমা ভাষা শিায়” পাঠদান করেন তিনি হলেন মি. মিহির ত্রিপুরা। মি. মিহির ত্রিপুরার সাথে একান্ত আলাপকালে তিনি জানান, “যখন ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মাতৃভাষায় (চাকমা ভাষা) পাঠদান করা হয় তখন শিার্থীরা খুব আগ্রহ এবং মনোযোগ সহকারে তা গ্রহণ করে। মাতৃভাষায় নিয়ম মাফিক পাঠদানের ফলে তাদের উপস্থিতি, ঠিকমত পড়া আদায় করাসহ বেশ কতগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে”। ভাষাটা যেহেতু চাকমা সে কারণে শিার্থীদের শুধু অঝাপাঠ (বর্ণমালা) আর মাত্রা চিহ্নগুলো শেখানোর পরেই তারা বইয়ের সবগুলো বিষয় সহজে আয়ত্ব করতে পারে। তিনি আরও জানান, মাতৃভাষায় শিা দানের ফলে এখানকার অভিভাবকদের মাঝেও অনেক আগ্রহ ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর ব্যাপারে তাঁরা আগের চাইতে যথেষ্ট সচেতন হয়েছে। আর একটি আনন্দের বিষয়, বিদ্যালয়ে শিশুরা মাতৃভাষায় শিাগ্রহণের দুই তিন মাস পর থেকে বাসায় বসে যখন মা-বাবা, ভাই-বোনদের নাম নিজস্ব চাকমা বর্ণমালায় লিখে দেয় এবং সন্ধ্যায় বাবা-মার পাশে বসে শিখিয়ে দেয়া ছড়া এবং গল্প বলতে থাকে তখন বাবা-মা’রা অনেক খুশি হয় এবং আত্ম-তৃপ্তিবোধ করে!

এইসব মনের অভিব্যক্তিগুলো জানতে পারলাম সেদিন কয়েকজন অভিভাবকের সাথে একান্ত আলাপকালে। একজন নারী অভিভাবক বিমলা দেবী চাকমা (বয়স: ৪২) তাঁর ছোট্ট মেয়েটির কথা বললেন, আমার মেয়ে নৈরঞ্জনা চাকমা ৫ম শ্রেণীতে পড়ে। বাসায় যখন মেয়েটি “চুমা ফুল চুমা ফুল, রাঙা রাঙা গুল গুল” কবিতাটি পড়ে শোনায় তখন তাঁদের খুব ভাল লাগে। কিন্তু তিনি দুঃখও প্রকাশ করলেন এ জন্যে যে, তিনি চাকমা বর্ণমালাগুলো পড়তে পারেন না! তাঁদের সময়ে তাঁরা মাতৃভাষায় পড়া-লেখা তো দূরের কথা, কোনো মতে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত  পড়েই বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে বিদায় নিতে হতো। তবে তিনি বিশেষ করে কোডেক কর্তৃপকে অনুরোধ জানান, “প্রতিবছর যেন অব্যাহত গতিতে মাতৃভাষায় শিা কার্যক্রম  চলতে থাকে।”পরে একই অনভূতি ও আবেদন নিয়ে একান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ঐ গ্রামের শান্তি কুমার চাকমা, সমীর কান্তি চাকমা, শক্তি মোহন চাকমা, কুশ বিকাশ চাকমা, সুভাষ মিত্র চাকমা প্রমূখ।

তারপর, রাঙামাটি পৌরসভার অর্ন্তগত আদিবাসী পাহাড়ী অধ্যুষিত একটি জনবহুল গ্রাম রাঙাপান্যা (রাঙাপানি)। যেখানে “যোগেন্দ্র দেওয়ান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়” নামে একটি শিা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ঐ বিদ্যালয়ে যিনি বর্তমানে প্রধান শিকের দায়িত্বে কর্মরত আছেন তিনি হলেন “চাকমা ভাষা ও বর্ণমালা” বিষষে অত্যন্ত দ ও অভিজ্ঞ। যিনি নিজ দায়িত্ব প্রতিপালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বহুবার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আদিবাসীদের মাতৃভাষা উন্নয়নে অদ্যাবধি পর্যন্ত সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছেন তিনি হলেন মি. প্রসন্ন কুমার চাকমা। তাঁর বিদ্যালয়ে কোডেক-রাঙামাটি প্রকল্প কর্তৃক পরিচালিত আদিবাসী ভাষা-শিা কার্যক্রমের আওতায় ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত মোট ৭১ জন ছাত্র-ছাত্রী নির্ধারিত বিষয়বস্তুর পাশাপাশি আদিবাসী ভাষায় (চাকমা) পড়া-লেখার সুযোগ পাচ্ছে। তাঁর সাথে একান্ত আলাপকালে তিনি বলেন, শিার্থীরা খুব আগ্রহ সহকারে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা গ্রহণ করে এবং এ বিষয়ে শিশুদের কোনো প্রকার অসুবিধাও হয় না।

তিনি কোডেক কার্যক্রমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “দাতা সংস্থাগুলো যতদিন সহায়তা প্রদান করবে ততদিন পর্যন্ত এনজিওগুলো কাজ করতে পারবে। কিন্তু এখানে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের আদিবাসীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিা প্রবর্তনের একটা সুযোগ রয়েছে। সেটা হলো “১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সম্পাদিত ঐতিহাসিক “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি” মূলে ১৯৯৮ সনে পার্বত্য জেলা পরিষদ বিলে সংশোধনী  এনে “মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিা” প্রদানের বিষয়ে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে”। তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে এবং উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে পিটিআই’তে ৪র্থ ব্যাচ পর্যন্ত বেশ কয়েকশ’ প্রাথমিক শিক-শিকিাকে চাকমা ভাষা বিষয়ে প্রশিণ প্রদান করা হয়। কাজেই আদিবাসীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিা নিশ্চিত করতে হলে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের অগ্রণী ভূমিকা পালন এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এভাবে একই বিষয়ের আলোকে পর্যায়ক্রমে একান্ত স্বাাৎকারে মূল্যবান অভিমত, পরামর্শ, দিকনির্দেশনামূলক সুপারিশ এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যথাক্রমে- রাঙামাটি সদর উপজেলাধীন সাপছড়ি ইউনিয়নের অর্ন্তগত সাপছড়ি যৌথ খামার রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিকিা মিস. শান্তা চাকমা, দিগলী বাগ রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক মি. প্রভু রঞ্জন চাকমা, বন্দুকভাঙা ইউনিয়নের অর্ন্তগত মাচ্ছ্যা পাড়া সরকারি প্রাথমিক দ্যিালয়ের প্রধান শিক মি. মনি রতন চাকমা, নোয়াদম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক মি. পরীতি চাকমা, সদর উপজেলার পৌরসভাস্থ কাটাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিকিা মানিতা চাকমা এবং বিহারপুর এলাকার পুলিন বিহারী দেওয়ান পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক মি. বিপিন চাকমা। তাঁরা সকলে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ  সুপারিশ আকারে প্রস্তাব করেন।

প্রস্তাবসমূহ নিম্নরূপঃ

১.         মাতৃভাষায় শিা দানের েেত্র আলাদা এক বা একাধিক সংশিষ্ট্য বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক/শিকিাকে নিয়োজিত রাখা।

২.         মাতৃভাষায় শিা দানের জন্য আদিবাসী বিষয়ক শ্রেণীভিত্তিক একাধিক আবশ্যিক বই/পুস্তক প্রণয়ন ও চালু করা এবং নির্ধারিত নম্বর প্রদান পূর্বক পরীা নেয়া।

৩.         মাতৃভায়ায় শিাদান প্রথম শ্রেণী  থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত চালু করা, সম্ভব হলে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা।

৪.         অন্যান্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সপ্তাহে কমপে চার/পাঁচ দিন পর্যন্ত পাঠ দান করা।

৫.         পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে এবং শিা ও সংস্কৃতি বিভাগের আওতায় মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা কার্যক্রম পরিচালনা করা। এবং সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রেড অনুসারে বৃত্তি প্রদান করা।

৬.         মাতৃভাষার গুণগতমান বৃদ্ধি, ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলা ভাষার পাশাপাশি মাতৃভাষার প্রতি আকৃষ্ট ও উৎসাহদান করার ল্েয সরকারিভাবে অনুষ্ঠিত বৃত্তির ন্যায় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে আদিবাসী মাতৃভাষা বিষয়ক তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত আলাদা একটি বৃত্তি প্রবর্তন করা।

তবে এতে অন্যান্য সাধারণ পরীা তথা পাঠদানের সাথে যাতে কোনো প্রকার সমস্যা বা অসুবিধার সৃষ্টি না হয় সেেেত্রও  ল্য রাখতে হবে।

অথবা অতি সহজভাবে এটাও করা যেতে পারে, ছাত্র-ছাত্রীদের একবার মাত্র চুড়ান্ত পরীার মাধ্যমে তাদের   মেধানুসারে কিংবা গ্রেড বা মার্ক ভিত্তিতে বৃত্তি প্রদান করা।

বৈশ্বিক প্রোপটে রাষ্ট্রের ভূমিকাঃ

বিশ্বের অধিকাংশ জাতিরাষ্ট্রসমূহ যারা কোন না কোন বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে এবং বৈশ্বিক সভ্যতায় তাদের কম-বেশী অবদান নিয়ে কোনো না কোনোভাবে গর্বিত। তারা তাদের নিজেদের দেশের অভ্যন্তরে বসবাসরত বিভিন্ন ুদ্র ুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিা, ভাষা, সংস্কৃতি ও নৃ-তাত্ত্বিক অস্তিত্ব রায় যতটুকু কার্যকর তৎপরতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করতে পারে, সেখানে ুদ্র ুদ্র এনজিও/সংগঠনের পে তা করা বড়ই সময় সাপে এবং দুরুহ ব্যাপার!

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। সারা বিশ্ব জানল একমাত্র বাঙালিরাই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। দেশের এই সুখকর ণটি বাঙালিদের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সকল আদিবাসীরাও গর্বের সঙ্গে উপভোগ করেছিল। যদিওবা এখনও পর্যন্ত আদিবাসীদের মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি নেই! তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে, আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিার অধিকারটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন সনদ কিংবা ঘোষণাপত্রে স্বারিত বিভিন্ন অঙ্গীকারসমূহ পরিপূরণ এবং বাস্তবায়নে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় আমাদের বাংলাদেশও একটি অন্যতম সমর্থন ও অনুস্বারকারী দেশ। ১৯৫৭ সালের ৫ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আই.এল.ও) ৪০তম অধিবেশনে ১০৭ নম্বর কনভেনশনের ২৩(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,“সংশিষ্ট জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদেরকে তাদের মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে শিাদান করতে হবে, কিংবা যেখানে এটা সম্ভব নয়, সেেেত্র তাদের সমগোত্রীয়দের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত ভাষায় শিা দান করতে হবে।” আই.এল.ও কনভেনশন ছাড়াও বাংলাদেশ সরকার স্বারিত আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ’-এর ৩০নং ধারায় আদিবাসী শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম চর্চা ও তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়াও বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র নিরসন কর্মসূচিকে বেগবান করার জন্য ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৫৫তম অধিবেশনে সকল সদস্য রাষ্ট্র একমত হয়ে কয়েকটি ল্য বা গোল স্থির করে যা মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল নামে বা (এম.ডি.জি) নামে পরিচিত। এর ৮টি ল্য অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে ১৮টি টার্গেট অর্জনের ঘোষণা করেছে। তার মধ্যে শিা অন্যতম। ল্য ২-এ উলেখ আছে যে, সর্বজনীন প্রাথমিক শিা অর্জন। এই ল্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশ (ক) প্রাথমিক শিায় নীট ভর্তির হার ১৯৯২-এর ৭৩.৭% হতে ২০১৫ সালের মধ্যে ১০০% উন্নীত করা। (খ) প্রাথমিক শিার ঝরে পড়ার হার ১৯৯৪-এর ৩৮% হতে কমিয়ে ২০১৫ সালের মধ্যে শূন্যে আনা।

তাই উপরোক্ত ল্যসমূহ পরিপূরণে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিা প্রবর্তনে  দাতা সংস্থা, সরকার তথা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদানসহ অগ্রণী ভূমিকা পালন করা একান্ত অপরিহার্য।

সুতরাং রাষ্ট্রীয় ও আর্ন্তজাতিক চুক্তি এবং সনদগুলোতে যে প্রতিশ্র“তি ও অঙ্গীকারসমূহ ব্যক্ত করা হয়েছে তার বাস্তবায়নে কালপেন শুধু ভাষাগত বৈচিত্র্যের বর্ণময়তাকে ¤ান করবে না, জাতিগত সংহতি প্রতিষ্ঠার েেত্র সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের যে সংহতি প্রতিষ্ঠার মতা তাও স্তিমিত হয়ে আসবে!

বিগত ২০০৫ সালে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত “উন্নয়নের চার বছর” নামক প্রকাশনার তথ্যমতে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় যেখানে ৩৯১ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১২৪ টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রোপটে রাঙামাটিতে কোডেক তার নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় ৪০টি বিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা কার্যক্রম পরিচালনা করা যৎসামান্য হলেও বিষয়টি আদিবাসীদের জন্য নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যেও ীণ আশার আলোকবর্তিকা হিসেবে বিশেষ অবদান রেখে চলছে। পার্বত্যবাসী নিঃসন্দেহে কৃতজ্ঞতাভরে কোডেক-এর এ মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে।

তবে সম্প্রতি বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক পরিচালিত প্রায় অর্ধশতাধিক নতুন বিদ্যালয়েরও সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানেও আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা দানের মহৎ পরিকল্পনা সন্নিবেশ করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়সমূহ ‘‘কমিউনিটি বিদ্যালয়” নামে গ্রীন হিল এবং টংগ্যা’র মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

এ ছাড়াও পার্বত্যাঞ্চলে আদিবাসীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা দানের বিষয়ে বেশ ক’টি এনজিও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন-কারিতাস, ব্র্যাক, জাবারং, সাস, তৈমু প্রভৃতি। তবে সম্প্রতি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ টঘউচ-ঈঐঞউঋ-এর অর্থায়নে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা কার্যক্রমের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, প্রশংসনীয় এবং দায়িত্ববোধেরও বহিঃপ্রকাশ বটে।

পরিশেষে আদিবাসীদের শিার মান উন্নয়ন, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সংরণ, প্রচার, প্রসার ও প্রচলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রোপটে কতিপয় সুপারিশমালা পেশ করা হলো ঃ

১.         আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের ল্েয তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সমন্বয়ে শিা ও সংস্কৃতি বিভাগকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র আদিবাসী শিা বোর্ড কিংবা কমিশন গঠন করা।

২.         প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে দ্বিভাষিক/বহুভাষিক শিাব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠদানের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করে শিক প্রশিণের ব্যবস্থা করা।

৩.         আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নকল্পে ুদ্র-নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট কেন্দ্রিক একটি আলাদা সেল গঠন করা।

৪.         আদিবাসী ভাষার রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান ।

৫.         লিখিতরূপ নেই এমন আদিবাসী ভাষার লিখিত রূপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

৬.         অনতিবিলম্বে আদিবাসী ভাষাসমূহের শব্দ সম্ভার নিয়ে শব্দকোষ তৈরি করা।

৭.         আদিবাসীদের বিভিন্ন পুঁথি, পালা গান, গীতিকাব্য, বৈদ্যশাস্ত্র প্রভৃতি সংগ্রহ করে প্রচার, প্রসার, প্রচলন, প্রশিণ ও সংরণের ব্যবস্থা করা।

উপসংহার ঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভাষা ও সংস্কৃতি রার জন্য শিার প্রাথমিক স্তরে নিজস্ব মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে শিা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে ও বাইরে ব্যবহারিক চর্চার সুযোগ উন্মোচিত করে দেবার বিষয়টি নির্ভেজাল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছার বিষয়। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজটিও কোনো জটিল বিষয় নয়। কারণ এখানে আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতাও নেই। “পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিা প্রদানের বিষয়টি বিধিবদ্ধ হয়ে আছে”। শুধুমাত্র পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের এই বিধি-বিধান বাস্তবায়নে অনুক’ল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্ত থাকলে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের শিার মান উন্নয়নে যেমন সহায়ক হবে তেমনি তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রার কাজটিও সুদূর প্রসারী  হবে।

তথ্যসূত্র:

১. আদিবাসীদের ভাষা, শিা ও সংস্কৃতির েেত্র ইউনেস্কোর ভূমিকা, (প্রবন্ধ) প্রফেসর

    মংসানু চৌধুরী।

২. রাঙামাটি: বৈচিত্র্যের ঐকতান ২০০৪ ইং, জেলা প্রশাসন, রাঙামাটি।

৩. উন্নয়ণে চার বছরঃ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, ২০০৫ ইং।

৪. গড়ঃযবৎ খধহমঁধমব ঈবষবনৎধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ঈঐঞ ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষব’ং ২০০১.

    ঙৎমধহরংবফ নু: ঘটঅড চঅঐজ, জধহমধসধঃর.

৫. “পাহাড়ে প্রাথমিক শিার হালচাল” গ্রিন হিল-এএবিরাইটস্ প্রকল্প, ২০০৭ ইং।

৬. বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য, সুগত চাকমা, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট-

    রাঙামাটি।

(বি.দ্র. বিগত ১৯ অক্টোবর ২০১০ ইং তারিখে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্মেলন কে কোডেক-রাঙামাটি কর্তৃক আয়োজিত  “প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আদিবাসী ভাষা শিা বিষয়ক আলোচনা ও মত বিনিময় সভা”য় এ গবেষণা প্রবন্ধটি পাঠ ও পর্যালোচনা করা হয় এবং গবেষণার সুবিধার্থে এ প্রকাশনা গ্রন্থে সন্নিবেশ করা হলো।)

এই বিভাগের আরো পোস্ট

Tags: