font-help

এই পোস্টটি 865 বার দেখা হয়েছে

বিলুপ্তির পথে জুম্ম ঐতিহ্য। শ্রী শ্যামল চাকমা

শ্রী শ্যামল চাকমা

বিলুপ্তির পথে জুম্ম ঐতিহ্য

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ী জুম্মদের বর্তমানে যে হাল হকিয়ত, বিশেষ করে সংস্কৃতি লালন ও চর্চাকরণের েেত্র পরসংস্কৃতি গ্রহণ, ধারণ ও চর্চার যে প্রতিযোগিতা তাতে করে স্ব-ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতির পরিমন্ডল হতে চ্যূত হয়ে কোথায় যে চলছে, তা হুট করে বলা সম্বভ না হলেও তবে গন্তব্য যে মুভ নয় তা সহজেই অনুমান করা যায়। জুম্ম পাহাড়ীদেরে মাঝে বিদ্যমান থাকা সুদীর্ঘ কালের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর লালন করে আসা সেই প্রাচীনতম সংস্কৃতি, স্বাতন্ত্রবোধের নিয়মনীতি ও প্রথাগত রীতি পদ্ধতি সমূহ মনে হয় দিনের পর দিন যেন মূল স্রোতদারা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মনেই হয়না পাহাড়ী জুম্মরা স্বসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী নিয়মনীতি সমূহ পালন ও চর্চাকরণে আগ্রহী। বর্তমানে তারা যে সব নিয়মনীতি ও আচার আচরণ চর্চা করছে, সেগুলো মূলতঃ পরসংস্কৃতি পনাতেই পূর্ণ, বিশেষ করে বাঙ্গালী সংস্কৃতি বোধেই ভরপুর। যা কোন অবস্থাতেই জুম্ম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কালব্যাপী বহমান ধারায় চলে আসা নিয়ম পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া একেবাইে দুরুহ ব্যাপার।

 

চাকমা সমাজে একটি প্রচরিত প্রবাদ আছে তা হলো  “চাকমার শিত হলে নাকি বাঙ্গালীপনার হাবভাব হয়।” অপরদিকে অন্যান্য জনগোষ্ঠীরা শিত হলেই চাকমা সংস্কৃতিধারী হয়। কথাটা প্রবাদ ও কাল্পনিক। তারপরও ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসা প্রবাদটি একেবারেই যে অমূলক তাও বলা যায় না। বরং ত্রে বিশেষে প্রবাদটি সঠিক ও বাস্তব প্রতিফলনই দেখা যায়। কেনান বর্তমানে জুম্ম পাহাড়ীদের মাঝে বিশেষ করে চাকমাদের মাঝে যে ধারায় সংস্কৃতি ধারণ, লালন ও চর্চা করণ চলছে, তা দেখে প্রতীয়মান হয় যে, পাহাড় দেশে প্রচলিত থাকা সে কাল্পনিক প্রবাদটি এখন আর কাল্পনিক নয়, বাস্তবই বলা চলে। বিষয়টি বেমানান হলেও একেবারেই যে অসত্য তা ধরে নেয়া যায় না।

 

ঐতিহাসিক তথ্য ও পূরোনো ধ্যান ধারণা সমূহ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে চাকমা সমাজ ব্যবস্থাটা কালে কালে যুগে যুগে নানা জাতির, নানা সংস্কৃতির সংমিশ্রনে যে একটি সংমিশ্রিত বাবধারা গড়ে উঠেছিল তা অবশ্যই অস্বীকার করার কোন উপায় নাই। কেননা চাকমা জাতির ইতিহাস এবং চাকমা রাজ বংশীয়দের পারিবারিক তথ্যাবলী বিশ্লেষণ করলে পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়, সুদূর অতীত কাল থেকে চাকমা সমাজে বাঙ্গালীপনা আর বাঙ্গালী সংস্কৃতি প্রতিপালন ও চর্চারণের টিত্রটি যে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত, তা সহজেই অনুমেয় হয় বটে। রাজা ধরম বক্স খাঁ আর জান বক্স খাঁ” উপাধি ধারন করে দীর্ঘ সময় রাজত্ব করা এবং সে সাথে খাঁ উপাধি ব্যবহার পরসংস্কৃতি ধারণ, লালন ও গ্রহণ পরাটাই বহিঃ প্রকাশ ঘটে। তবে একথাও ঠিক যে, চাকমা রাজ বংশীয় তথা রাজ পরিবারের একটি ুদ্র অংশ পর সংস্কৃতি চর্চা ও লালন করলেও বৃহত্তর চাকমা সমাজে বা সমাজ ব্যবস্থায় ইহা তেমন প্রভাব ফেলতে সম হয়নি। তাইতো বলা যায়, চাকমা সমাজ ব্যবস্থাটা বরাবরই স্বতন্ত্র অবস্থায় বিদ্যমান থেকে স্বসংস্কৃতি, নিজস্ব রীতি পদ্ধতি ও প্রথাগত ধ্যান ধারণা সমূহ যথাযথভাবে পালিত হয়ে এসেছে। আগেকার দিনে চাকমা সমাজে বিয়েসাদির েেত্র পৌরহিত্য করতো গ্রামে ওঝা-বৈদ্যরা। শুকর ও মুরগী জবাই কের বিয়ের সময় করা হতো “চ্যুমুলাং পূজা”। খালে বা ছড়ার পাড়ে ফুল দিয়ে পূজার অনুষ্ঠান আয়োজন করে মাথা ধোঁয় পূজা করা হতো।

 

চাকমারা এটিকে “চুল আগা” ধোয়া বলে। এই পূজা করা হতো মূলতঃ বাংলা নববর্ষের ১লা বৈশাখে। আবার ত্রে বিশেষে, বিশেষ করে কোন পরিবারে কারোর মৃত্যু হলে তখন এ পূজা আয়োজন করে পরিশুদ্ধ হতো। চাকমারা একে বলে, “মরা-ফি ফেলানা”। এখন আর আগের মত চ্যুংগুলাং পূজা হয় ন্ গ্রাম্য ওঝা-বৈদ্যের পরিবর্তে ধর্মীয় গুরু/ভিুর মাধ্যমে বিয়ে-সাদীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। চাকমা সমাজে গেংখুলি গান, বার মাস্যা গান ও শিবচরণের নানা গীতি কাব্য চাকমা সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তছাড়া বিভিন্ন রূপকথার গল্প, চাকমার পজ্জন বলে থাকে। চারণ কবিদের গাওয়া ছড়া গান, কবিতা আর পুরানা কাহিনী সমূহ যা চাকমা সংস্কৃতির একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক কিন্তু সেগুলো আজ লুপ্ত প্রায়। আধুনিকতার নামে চাকমা সমাজে যে সামাজিক কাঠামোটা বর্তমানে প্রবর্তিত হচ্ছে, সেটি একটি নোংরা ও বেহায়াপনা সংস্কৃতি কাঠামো বলা যায়। ফলে ঐতিহ্যগত রীতি ও সামাজিক নিয়মনীতি সমূহ সুদীর্ঘকাল ধরে স্বসংস্কৃতির আদরে প্রবর্তিত হয়ে আসলেও এখনকার অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পর সংস্কৃতি ও ভিন্ন আচরণগত কাঠামো চাকমা সমাজ ব্যবস্থায যেবাবে অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে, এতে মনে হয় চাকমারা বুঝি স্বসংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র ঐতিহ্য থেকে সরে এসছে কিংবা আদিকালের ধ্যান ধারণাকে সেকেলে মনে করে পরিত্যাগ করেছে।

 

বর্তমানে আধুনিক/মর্ডান/লেটেষ্ট/অগ্রসর/প্রগতিশীল নামক শব্দ সমূহ চাকমা সমাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধর্মীয় রীতিনীতি ও সমাজিক আচার আচরন থেকে আরম্ভ করে সমাজে এমন কোন কাজকর্ম নাই, যা কিনা আধুনিকতাকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে না। বর্তমানে যুব শ্রেণীতে নাম রাখা, কথাবার্তা বলা চাল-চলন, পোশাক আশাক, খাওয়া দাওয়া ও আচার ব্যবহারের ত্রে এমন ভাবে আধুনিকতার লেবাস পড়ানো হচ্ছে, ভয় হয় আগামী কয়েক বৎসর পর চাকমাদেরকে পরসংস্কৃতির আদলে বসবাস করবে কিনা।

 

একটা বিষয়ের উপর উদাহরণ দিলে চিত্রটি যে কত ভয়াবহ তা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তাহল, নাম রাখার েেত্র। যেমন আগেকার নিদেন নবজাতক ছেলে মেয়েদেরকে নাম রাখা হত পেজাল্যা, ধলাচান, ননাবী আর ধক্কবি নামক জুম্ম সংস্কৃতি নির্ভর নাম। বর্তমানে রাখা হচ্ছে সুহেল, সোহাগ, জেসমিন, রূপালী আর কিনটন নামক পর সংস্কৃতি নির্ভর নাম। কাজেই অবস্থাটা অনুমান কা কোন ক্রমেই কঠিন নয় যে, বিষয়টি কতটুকু ভয়াবহ। এভাবে চলতে থাকরে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চাকমারা পূর্বেকার নাম রাখার েেত্র যে পদ্ধতি বা প্রবণতা ছিল তাও হারিয়ে ফেলবে এতে কোন সন্দেহ নাই। আগেকার দিনে বিয়ে-সাদীর েেত্র বিশেষ করে কনে নিয়ে আসার েেত্র স্বর্ণালংকার, পোশাক-আশাক আর মেকাপসহ নানাবিধ সামগ্রী বহন করা হতো “ফুল বাড়েঙ” নামক একটি কারুকার্যময় হাতের তৈরী বস্তুতে। অথচ বর্তমানে “ফুল বরেঙ” এর নাম অনেক চাকমাই জানে না কিংবা শুনেছে বলে মনেই হয় না।

 

চাকমা সমাজের মূল উৎসব হলো বিঝু উৎসব। সারা বৎসর খাটুনির পর চৈত্রের শেষান্তে যখন এ উৎসব আগমন ঘটে, তখন এ উৎসবকে ঘিরে সারা পার্বত্য অঞ্চলে আনন্দের ঢেউ কেলে এবং সাঁঝ সাঁঝ রবে মেতে উঠে সমগ্র পার্বত্য উপত্যাকা। যুবা-বৃদ্ধ থেকে আরম্ভ করে শিশু-কিশোরসহ সমাজের এমনকোন শ্রেণীর লোক নাই, এ উৎসবকে ঘিরে মাতোয়ারা হয়ে না ওঠে।

 

আগেকার দিনে প্রায় একমাস আগে থেকে বিঝু উৎসব পালনের প্রস্তুতি চলতো। প্রতিযোগীতা হতো মদ, জগরা আর কানজি তৈরীর। তাইতো বিঝু উৎসব গুলোতে এসব মদ, জগরা, কানজি পাইসন বিনিভাত, কোণভাতসহ নানা ধরণের জুম্ম সংস্কৃতি নির্ভর খাবার-দাবার আয়োজন করা হতো। অথচ বর্তমান বিঝুর অবস্থাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধর্মীয় রীতিনীতি বিরুদ্ধ আখ্যা দিয়ে মদ, জগরা কানজি তো কবেই ওঠে গেছে। অপরদিকে খাবার দাবারে এসেছে এক আমুল পরিবর্তন। আগের মত বিনিবাত, কোণভাত আর ঐতিহ্যগত পাইসন এখন আর ব্যবহার চলে না। এসব জুম্ম খাবারের স্থান দখন করেছে সেমাই, বিরানী আর বিভিন্নজাতের কোমল পানীয়সহ নানা জাতের আধুনিক কাবা-দাবার সামগ্রী।

 

অপরদিকে পোশাক-আশাকের পরিবর্তনের হালটা আরো লনীয়। আগেকার দিনে চাকমা সমাজে জাতীয় পোশাক হিসেবে বিবেচিত হতো পিনোন আর কাদি। নব বধূ থেকে আরম্ভ করে অতীশ্রি বৃদ্ধ পর্যন্ত পিনোন খাদি ব্যবহার করতে গর্ববোধ করতো কিন্তু এখনকার অবস্থা শুধু ভিন্ন। কজন চাকমা মেয়ে এসব ব্যবহার করে। শাড়ী, ম্যাকসী, সেলোয়ার, কামিজ আর কত নাম না জানা পোশাক-আশাক যে ব্যবহার করছে; তার যেমন সঠিক পরিসংখ্যান নাই, তেমনি এসব নাম জানাও বেশ কঠিন। কাজেই একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, চাকমার পোশাক সংস্কৃতি পর্যন্ত হারাবে আগামীতে। কথা বার্তাতো বাঙ্গালীপনা হয়েছে অনেক এগেই। অনেক শিতি চাকুরে রয়েছে যারা মাতৃভাষার পরিবর্তে বাংলাবাষা ব্যবহার ও কথা বলতে বেশী আগ্রহী বলে মনে হয়। শুধু তাই নয় নিজেদের ছেলে মেয়েদেরকে নিজ মাতৃভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষা শিখাতে এবং বলাতে বেশী আগ্রহী দেখা যায়। তাইতো অনেক শিত চাকুরীজীবির ছেলেমেয়ে বাংলাভাষা ব্যবহার ও কথাবার্তা বলা ছাড়া নিজ ভাষাতেই পর্যন্ত কথ বলতে পারে না। একদিন কথাচ্ছলে ধূল্যা কি জিনিস এক পরিচিত জন জানতে চায়। বললাম, বাংলায় যাকে বালি বলে সেটি চাকমা ভাষায় ধুল্যা বলে। সে বন্ধুটি এখনো জানেনা, অজলেঙ, ইন্দোর, পেলেপেলে, রিপ রিপ ও পাক্কোন কাকে বলে। বন্ধুটি আমার শিতি এবং মাঝ বয়সী একজন ভদ্র লোক। অথচ চাকমাদের আসল শব্দ ভান্ডার তার জানা নেই। তাহলে তার প্রজন্মদের কি হবে, তা অবশ্যই বিবেচনার দাবী রাখে।

 

অতএব, লেখার শুরুতেই সে প্রবাদটি কথা বলে ছিলাম, তা যে একেবারেই মিথ্যা নয়, এটি অবশ্যই নির্দ্ধিধায় বলা যায়, চাকমারা শিতি হলেই বাঙ্গালীপনার হাবভাব হয়। এেেত্র আগামী পাঁচ দশ বৎসর পর চাকমাদের সামাজিক কাঠামোটা কি হবে কিংবা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের অবস্থা কি হবে, তারার কি স্বসংস্কৃতি দারণ করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্র আর স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বা নিয়ে বেঁচে থাকবে, নাকি পর সংস্কৃতি ধারণ করে অতি পূর্বেকার জুম্ম সংস্কৃতির মূল ধারা তেকে হারিয়ে যাবে, তা এখনই ভাববার সময় এসেছে। কেননা এ গন্তব্য যে শুভ নয় তা পরিস্কার উপলব্ধি করা যায়। আমরা যে কোথায় চলেছি, কোথায বা আমাদের ঠিকানা, যে ঠিকানা কারোর জানা নেই।

 

বিদ্রঃ- এই লেখাটি ২০১০ ইং সালে বনযোগীছড়া কিশোর কিশোরী কল্যাণ সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত স্ববন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

 

 

 

 

 

এই বিভাগের আরো পোস্ট

Tags: