font-help

এই পোস্টটি 1,876 বার দেখা হয়েছে

ইদানীং থাইল্যান্ড ভ্রমনঃ মার্চ ২০১০

ইদানীং থাইল্যান্ড ভ্রমনঃ মার্চ ২০১০। চাঁদ রায়

বেলা ২টায় সম্ভবত থাই এয়ার ওয়েজের বিশাল এয়ার বাস ঢাকা বিমান বন্দর থেকে উড়াল দিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যংকক শহরের উদ্দেশ্যে। আমি কালে ভদ্রে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাই। সুযোগ এলে হাত ছাড়া করি না। এবারের বিদেশ সফর থাইল্যান্ডের উত্তরে রাজধানী শহর, চিয়াংমাই। এশিয়ান ইন্ডিজিনাস পিপলস পেক্ট নামে একটা সংস্থা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এনজিও কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিণ আয়োজন করেন। প্রশিণের আয়োজকদের সাথে ই-মেইলে আমি যোগাযোগ করি। বাংলাদেশ থেকে সম্ভবত আট থেকে বার জন আবেদন করেছিলেন। মনোনীত হয়েছেন শুধু দুজন এনজিও সংস্থা ‘কারিতাস’ থেকে ক্যামিলাস গান্ধী আর ‘কোডেক’ থেকে আমি। আমার মনে হয় মাঠ পর্যায়ে একজন উন্নয়ন কর্মী হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে প্রশিনার্থী মনোনয়নে। আমি প্রশিণে আবেদন করেছি আমার কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে। আমি বিগত নয় বছর থেকে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার গ্রামাঞ্চলে তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটির আর্থ সামাজিক উন্নয়ন মূলক কাজ করার সাথে সম্পৃক্ত। একই সঙ্গে আমি কর্মএলাকায় উদ্দীষ্ট আদিবাসীর জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরণে ও উন্নয়নের কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত। এই কাজের অভিজ্ঞতা Asia Indeginous people’s Pact(AIPP) মূল কাজের সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। দ্বিতীয়ত আবেদনের দরখাস্তে যে দুজনকে Refree হিসেবে উল্লেখ করেছি, তাদের একজন হলেন আমার সংস্থা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) নির্বাহী পরিচালক, আমার শ্রদ্ধাভাজন ড. খুরশীদ আলম অন্যজন হলেন ড. স্বপন আদনান, সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন সাবেক অধ্যাপক। কাজেই দুজন পি,এইচ,ডি ডিগ্রীধারী পন্ডিতের সুপারিশ আমাকে এই প্রশিণ কোর্সে মনোনয়ন করার ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ সহায়তা করেছে।

 

যাই হউক, বিমানে উঠবার আগেই দেখা হয়েছিল স্নেহভাজন বর্তমান চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়ের সাথে। তিনি ব্যাংকক হয়ে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছিলেন তার ব্যক্তিগত কোন কাজে। বিমানে উঠবার পর তিনি আমাকে তার পাশের সিটে বসার আহ্বান জানালেন। সৌভাগ্য ক্রমে ঐদিন আসনটি খালি ছিল। আমরা ইকোনমি কাসে ভ্রমণ করছি। তিনি নিয়মিত বিদেশে যান বলে বিমানে টিকেট বুক করার ক্ষেত্রে  কোন আসনটি আরামদায়ক বা একটু প্রাইভেসি রেখে ভ্রমণ করা যায় সে সমন্ধে অভিজ্ঞ। আমার পাশে বসেছিলেন চট্টগ্রামের চকরিয়া থেকে একজন রাখাইন যুবক। সে ব্যাংকক যাচ্ছে। তার সাথে কথা বলে বুঝলাম সে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকায় কোন এক মিশনারী স্কুলে ইংরেজী শিখতে যাচ্ছে।

আমি সে রাখাইন যুবক থেকে বিদায় নিয়ে স্নেহভাজন দেবাশীষের পাশে বসলাম। দুজনে গল্প শুরু করলাম। সে বললো বিমান ভ্রমণে এই আসনটাই বরাবর বেছে নেয়। কিছুন পর উড়োজাহাজে সুন্দরী, তন্বী বিমান বালা তরল পানীয় পরিবেশন করা শুরু করলো। আমাদের কাছে আসতেই আমি তার কাছে লেবু দেওয়া সাদা রঙের উষ্ণ পানীয় জিন  চাইলাম। বিমান বালা সহাস্যে জিন পরিবেশন করলো আমাকে। কিছুণ পর আবার লাঞ্চ বা দুপুরের খাবার। সুখাদ্য ও উপাদেয় খাবার বলতেই হয়। আন্তর্জাতিক বিমান কোম্পানী গুলো সুস্বাদযুক্ত খাবার পরিবেশন করে। মৃদু উষ্ণ পানীয় পান করতে করতে ও গল্প করতে করতে দীর্ঘ আড়াই ঘন্টা উড়াল সময় ফুরিয়ে আসছিল। বিমানে উঠার পর বিমানে ছোট পর্দায় যখন ঘোষনা করা হচ্ছিল ঢাকা থেকে ব্যাংকক আকাশ পথে দূরত্ব সম্ভবত ৮৭৫ মাইল। ঢাকা ও দিলীর দূরত্ব প্রায়ই সমান বোধহয়। আমার মনে হচ্ছিল তাহলে ব্যাংকক ঢাকা থেকে খুব বেশী দূরে নয়। যাই হউক এক সময় বিমান ব্যংককের সুবর্ণ ভূমি এয়ার পোর্ট এসে পৌঁছলে যাত্রীদের অবতরণ সময় হলো। আমরা নেমে পড়লাম। সুবিশাল এই সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্ট। দেবাশীষের এসব বিমান বন্দরে অনেকবার আসা যাওয়া তাই বেশ পরিচিত। ও আমাকে যথেষ্ঠ সাহায্য করলো। সে পথ চিনিয়ে নিয়ে গেল। এক সময় ও আমার থেকে বিদায় নিয়ে ব্যাংকক এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গেলো। এবার একাকী পথ খুঁজে বের করলাম। এক সময় দেখি আমার মতো চিয়াংমাই যাচ্ছেন একই ফাইটে ঢাকা ণগঈঅ স্কুল ও কলেজের প্রিন্সিপাল একজন ভদ্র মহিলা। পরিচয় হলো। তিনি জানালেন রাঙ্গামাটি জেলার চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালের প্রাক্তন সুপারিটেন্টেন ডা: শুয়ে লা মং চৌধুরী তার সুপরিচিতি। স্বল্প আলাপে জানালেন যে তিনি কয়েকবার চিয়াংমাই এসেছেন। দণি এশিয়ার ফিলিপাইন ভিত্তিক মিশনারী সংস্থা মাঝে মাঝে সম্মেলন আয়োজন করেন। তিনি সেই সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন।

 

এক সময়ে সুবর্ণভূমি বিমান বন্দরে আমরা চিয়াংমাই যাওয়ার বহিগমন পথ খুঁজে নিলাম। স্থানীয় সময়ে ৭- ১০ মিনিট আবার চিয়াং মাই এর উদ্দেশ্যে থাই এয়ার ওয়েজ জম্বু জেট বিমানে উঠলাম।

 

আবার এক ঘন্টা বিমান আকাশে উড়লো। সহ- যাত্রীদের মনে হলো দু একজন ইরানী, ইউরোপীয় ও থাই নাগরিক। চা- কফি ও হাল্কা খাবার পরিবেশন করা হলো এক ঘন্টার মধ্যে আবার অবতরন বিমান থেকে নির্ধারিত জায়গায়।

 

আমরা ব্যাগ খুঁজে নিলাম। তারপর বিমান বন্দর থেকে বেড়ানোর আগে একশত ডলার মুদ্রা বিনিময় করে নিলাম একটা বিদেশী মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রে।

 

বিমান থেকে লাগেজ নিয়ে বের হওয়ার সময় দেখলাম আয়োজকদের প্রেরিত একজন গাড়ীর চালক একটা কাগজে আমার নাম লিখে আমার অপোয়। ইত:মধ্যে এই বিমান বন্দরে আরো দুজন সহ- প্রশিনার্থী  অপোয় ছিলেন। অল্পণ পরেই মাইক্রোবাস চালক আমাদের তিন জনের লাগেজ গাড়ীতে উঠিয়ে মাইক্রোবাস ছেড়ে দিলো গন্তব্য স্থান খুম পুখোম হোটেলের উদ্দেশ্য।

 

হোটেল পৌঁছেই দেখা হলো খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা থেকে অওচচ তে কর্মরত বিনতাময় ধামাই এর সাথে। সে বয়সে তরুন। আমার সাথে সম্ভবত এই প্রথম দেখা। দুজনের জন্য নির্ধারিত একটি রুমে লাগেজ নিয়ে লিফটে চার তলায় পৌঁছলাম। দু’জন প্রশিণার্থীর জন্য একটি করে রুম বরাদ্দ করা হয়েছে। একজন হোটেল বয় আমার লাগেজ বহন করে নির্ধারিত রুমে পৌঁছে দেয়। স্নান সেরে কিছুনের মধ্যে হোটেলের নিচ তলায় নেমে এলাম।

 

বিনতাময় আমার অপোয়। তাকে নিয়ে হোটেল থেকে নিকট দূরত্বে একটি রাস্তার পাশের ছোট্ট রেঁস্তোরাতে মাত্র পঁচিশ বার্থ (থাইমুদ্রা) খরচ করে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। বিনতা বলল খাগড়াছড়ি থেকে একজন মহিলা এই প্রশিণে অংশগ্রহন করার কথা ছিল। কিন্তু খাগড়াছড়িতে গোলমাল ও সংঘাত হওয়ায় সে এই প্রশিণে অংশগ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে। তার জানা মতে এ যাবত কোন মহিলা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এই প্রশিণে অংশগ্রহণ করেনি।

 

একসময় হোটেলে ফিরে আসলাম। রাতটা কেটে গেলো। সকাল হতে প্রাতকৃত্য শেষ করে প্রাতরাশ: করার জন্য হোটেলের নীচ তলায় গেলাম। সকালের নাস্তায় প্রচুর খাবার। পাউরুটি, মাখন, ডিম, ফলের রস, সসেজ, বেকন। এছাড়া কিছু স্থানীয় ফল, যেমন পেঁপেঁ, চিনার, আনারস, তরমুজ।  সকলে ৯টায় আমরা অংশগ্রহণকারীরা প্রশিণ কে একত্রিত হলাম। ইতঃমধ্যে গতরাতে কয়েকজন অংশগ্রহণকারীর সাথে পরিচয় হয়েছে। প্রশিণ কে পরিচিতি পর্বের পরে কাস শুরু হলো। একজন দ প্রশিক এসেছেন অষ্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা। তিনি আইন বিষয়ে একজন ব্যরিষ্টার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা। পাঠদানে বুঝতে পারলাম তিনি একজন দ শিকিা নিঃসন্দেহে। তার পাঠ উপস্থাপন শিার্থীরা সহজেই বুঝতে সম। মানবাধিকার ইতিহাস নিয়ে পাঠদান শুরু করলেন তিনি। তিনি বললেন, মানবাধিকার বিষয়ে সর্ব প্রথমে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে উল্লেখ করা হয়। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে ১৭৭৬ সালে। স্বাধীনতায় ঘোষনাপত্র বলা হয় জন্মকালে সব মানুষই সমান। এরপর আসে ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপব। সেখানে বিপবীরা ঘোষনা দিলেন The Declearation of the Rights of man. ‡mB †Nvlbvq ejv nj man were by nature equal. মানুষ প্রকৃতগতভাবে সমান। এইভাবে প্রথম মহাযুদ্ধ ১৯১৪- ১৯১৮ সালের পর লীগ অব নেশনস তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে শেষে ১৯৪৫ সালের পর জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এই সুদীর্ঘ ইতিহাস খুব সুখকর নয়। এই দুইটি বিশ্ব যুদ্ধে কোটি কোটি নর- নারীর মৃত্যু হয়। উপনিবেশকতার অবসানে বিভিন্ন জাতিগত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ। এই মাত্র সেদিন ১৯৪৭ সালে ভারত, পাকিস্তান স্বধীনতা লাভ করলো দুইশত বছরের বৃটিশ শাসন নাগপাশ ছিন্ন করে। আমরা বাংলাদেশীরা স্বাধীন হলাম ১৯৭১ পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে, বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা কিভাবে আদিবাসীদের অধিকার সংরণে ভূমিকা পালন করছে সে বিষয়ে আমাদের পাঠদান করেন। বিভিন্ন দেশের প্রশিণে অংশগ্রহণকারীরা তার নিজ নিজ এনজিও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কি কার্যক্রম পরিচালনা করছে তা উপস্থাপন করছেন। বারটি দেশের ৩০ জন প্রশিণার্থী এই কোর্সে অংশগ্রহণ করে। বয়সে সবাই অপেকৃত তরুন। সব চাইতে বয়স্ক হলেন নিউজিল্যান্ড থেকে একজন মাউরি মহিলা, তিনি বয়সে ষাট উর্ধ্বে। আর আমি ষাটের কাছাকাছি। ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভাষাভাষি ভিন্ন  সংস্কৃতির প্রশিনার্থী হলেও সবার মধ্যে যে নুতন কিছু জানবার ইচ্ছা তাদের দলীয় কাজে অংশগ্রহন এটা বেশ লনীয়। মিস্ জর্জিনা (এঊঙজএওঘঅ) যিনি নিউজিল্যান্ডের মাউরি আদিবাসী হলেও তার ইংরেজী কথা বলার ধরন একেবারে ইংরেজ কোন মহিলার মতোই। আবার অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসী মিশেল ও সিনা চলনে বলনে ও ইংরেজ মহিলার মতো। আরো ল্য করলাম চমৎকার ইংরেজী বলতে পারে দেখলাম প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফিজি দ্বীপপুঞ্জ থেকে আগত তিনজন প্রশিনার্থী। দুজন অপোকৃত বেশী বয়সী হলেও একজন বয়সে তরুনী। তার চেহারাটা অনেকটা দণি ভারতীয় তরুনীদের মতো।

 

বার্মা ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আগত বয়সে তরুন- তরুনীদের অংশগ্রহণ আমার সব চাইতে বেশী আকর্ষনীয় মনে হয়েছে। ওরা সত্যিকার অর্থে তৃনমূল পর্যায়ে কমিউনিটি বা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত। তাদের কথায় বুঝা যায় যে তারা এ ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ। ২৩ ও ২৪ শে মার্চ যথারীতি হোটেলের প্রশিণ রুমে প্রশিণ চলতে থাকে। চতুর্থদিন ২৫ শে মার্চ সকাল ৮.৩০ টার মধ্যেই প্রশিনার্থীরা কয়েকজন আয়োজক কর্মকর্তাসহ আমরা ১২০ কিঃমিঃ দূরে চিয়াংদাই জেলার নিকটবর্তী একটি আদিবাসী গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমাদের বাহন মাইক্রোবাস। গাড়ীতে বসে ভ্রমনের সময় ল্য করলাম সড়কের দু’পাশে পাহাড়াগুলিতে বেশ গাছ-গাছালী। রাস্তার দু’পাশেই উঁচু নিচু পাহাড়। পূর্ব নির্ধারিত গ্রামে পৌঁছলাম প্রায় ১১টার সময়। এই গ্রামে ৮৭টি পরিবারের বসবাস করে। যিনি গাইড তার বর্ণনায় বুঝা গেল গ্রামবাসীরা আর্থিকভাবে নড়ে বড়ে অবস্থায় আছে। মূলত তারা বেশ কয়েক বছর আগে বার্মা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এই এলাকায় চলে এসেছে। তারা পালুং আদিবাসী জনগোষ্ঠীভূক্ত। মহিলারা দেখলাম তাদের নিজ হতে তৈরী বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির জন্য গ্রামের মাঝখানে কমিউনিটি সেন্টারে পসরা সাজিয়েছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কেনাকাটা করছেন। আমি ছোট দুটা মানিব্যাগ  কিনেছি।

 

পালুং জনগোষ্ঠীর গ্রাম প্রধান ও কয়েকজন মহিলার সাথে ফোকাস গ্র“প ডিসকাসন বা দলীয় আলোচনা শুরু হলো আমাদের। তাদের জীবন ও জীবিকার সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রশ্ন করলাম আমরা। আলোচনায় জানা গেল যে, তাদের এখানে নিরাপদ পানির সমস্যা আছে। মজুরী েেত্র পুরুষ মহিলার বৈষম্য আছে। মহিলারা পুরুষদের তুলনায় কাজে কম পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। শুধু সম্প্রতি সরকার থেকে ত্রিশ বছরের মেয়াদী শর্তসাপেে ভূমি পেয়েছেন। সেই ভূমিতে দেখলাম তারা বিভিন্ন ফলদ গাছ রোপন করেছে। যেমন- কলা, আম, লিচু ও অন্যান্য স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য ফলদ গাছ। আমগাছের চারাগুলি বেশ পোক্ত মনে হলো। গ্রামের প্রধান, একজন মহিলা আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। এক সময় আলোচনা শেষ হলো। স্বল্প সময়ের জন্য পালুং তরুনীরা, তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নৃত্য পরিবেশন করলো। গ্রামের প্রধান তার ঐতিহ্যবাহী বেহালা ‘তান্দুং’ বাজালেন আর তরুনীরা তালে তাল মিলিয়ে সহজ ও সরল ভাবে কমিউনিটি সেন্টারে নৃত্য পরিবেশন করলো।

 

একসময় নাচ শেষ হলো আমরা বাসে উঠলাম। দুই তিন কি:মি: যাওয়ার পর ‘পালাই’ নামে একটি গ্রামে পৌঁছলাম। গ্রামের রাস্তা ভাল। এই গ্রামে যাওয়ার পথে দেখলাম বেশ কয়েকটা আমের বাগান।

 

এই ‘পালাই’ গ্রামে থাইল্যান্ডের কয়েকটা আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাস করে। তাদের মধ্যে উলেখযোগ্য হলো ‘কালীন’, ‘লিসু’ ‘আকা’। বেশ বড় গ্রাম। গ্রামের যাওয়ার পথ দেখলাম একটি গির্জা। বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইন দেখলাম। গ্রামের বাড়ি গুলিতে সামনে দেখলাম বেশ কয়েকটি মোটর সাইকেল, দুই একটা জীপ গাড়ি ও দেখলাম। মনে হলো এই গ্রামের লোকজনের আর্থিক অবস্থা ভালো। গ্রামের নিকটে একটি পাহাড়ের উঁচু চূড়া দেখা যায়, আমাদের গাড়ীর চালক, ভাঙ্গা ইংরেজীতে বললো যে, এখানে কয়েক বছর আগে হলিউডের চল চিত্রায়ন হয়েছে।

 

গ্রামের প্রধানের বাড়ির একটা ছবি নিলাম, গ্রামের রাস্তা দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে একটু হাটলাম। একজন একজন এনজিও কর্মীর সাথে আলাপ করলাম। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সমন্ধে জানতে চাইলাম। সে জানানো যে, গ্রাম প্রধান মূলত গ্রামবাসীরা নির্বাচন করে। ষাট বছর পর্যন্ত সে পদে থাকতে পারে। সরকার থেকে মাসিক একটা ভাতা পায়। অল্পন পরে আমরা ফিরে আসলাম ‘পালুং’ গ্রামে। সেখানে এসে দুপুরের খাবার খেলাম। খাবার অল্প আগে আমাদের একজন প্রশিকের সাথে গল্প হলো। মায়ানমার বা বার্মায় তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বললো। বেশ কয়েক বছর আগে সে প্যগান শহরে ভ্রমন করেছে। তার মতে এই প্যগান শহরটাকে প্রাচীন মন্দিরের শহর বলা যায়। প্যগান একটা চমৎকার প্রাচীন শহর। যে শহরে প্রচুর প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের নির্দশন এখনও দেখা যায়।

 

আমরা প্রায় তিনটার দিকে আবার মাইক্রোবাসে উঠলাম। আমার পাশে বসেছিলেন অওচচ একজন স্থানীয় মহিলা কর্মকর্তা বেশ সদালাপী তার গল্প বলে যাচ্ছিল সে। সে একটা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর লোক। বাড়ীতে তার ছোট শিশু আছে। তার মাকে দেখাশুনা করতে হয় সেই শিশুটিকে। তার বাবা থাকে গ্রামে চিয়াংমাই শহর থেকে অনেক দূরে।

 

আমরা বেলা চারটায় হোটেলে ফিরে আসলাম। আমাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন চিয়াংমাই এর বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ধই সুথেপ (Doi- SUTHEP) বৌদ্ধ মন্দির দর্শন করতে গেলাম। শহর থেকে আধ ঘন্টা দূরত্বের এই বৌদ্ধ মন্দির। শহর পেরিয়ে মন্দিরের উঁচু পাহাড়ে চূড়ায় যাওয়ার পথে দুধারে দেখলাম গাছ- গাছালি পরিপূর্ণ বন। মনে হলো বন- সংরনে লোকজন যথেষ্ঠ সহযোগিতা করে। রাস্তায় দুই পাশে কোন জনবসতি নেই। তবে যাওয়ার পথে দুই একটা পর্যটকদের জন্য বাচাই করা জায়গা আছে। পর্যটক দর্শনার্থী ও পূজারীদের মন্দিরে আসা-যাওয়া চলছে। মন্দিরে উঠার দুইটা ব্যবস্থা আছে। একটা খরভঃ আছে আর তিনশতের উপর পাঁকা সিঁড়ি। লিফটে চড়লে ভাড়া দিতে হয়। বিনতার পরামর্শ ও নিজে সাহস করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরে। পাহাড়ের পাদদেশে দেখলাম বেশ কিছু দোকান যেখানে বিক্রি হচ্ছে নানা শিল্প পন্য সামগ্রী। পঁচিশ বার্থ দর্শনী দিয়ে একটা টিকেট কিনলাম। ঐ টিকেট নিয়ে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করলাম। বাতি জ্বালিয়ে তথাগত ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলাম, জগতের সকল প্রানী যাতে সুখী হয়।

 

সিঁড়ি উঠবার সময় দেখলাম একদল শ্রমন নামছে সিড়ি দিয়ে নীচের দিকে। সবাই বয়সে কচি। মন্দিরের চুঁড়া থেকে চিয়াংমাই শহরটা দেখতে বেশ ভালই দেখায়। দুই একটা ছবি তুলনায় ভাল হয়েছে। মন্দির দর্শন শেষে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করলাম। এই সময় কম্বোডিয়া থেকে আগত একজন তরুন প্রশিনার্থী আমাকে হাত ধরে নীচে নামতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো। ভালো লাগলো তার এই মানবিক গুন। নীচে নেমে দোকান থেকে দুইটি বাটিক ছবি কিনলাম। দামটা মনে নেই তবে একশ থাই মুদ্রার কাছাকাছি। তারপর ফিরবার পালা। সে রাতেই আমাদের হোটেল থেকে দশ থেকে পনের মিনিটে পাঁয়ে হাটা দূরত্বে একটা. রেঁস্তোরায় আমাদের রাতের খাবার ব্যবস্থা করা হয়। আগে বলা দেয়া হয়েছিল প্রশিনার্থীদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে সান্ধ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করার জন্য।

 

আমরা কয়েকজন হেঁটে গন্তব্য পৌঁছলাম ইত:মধ্যে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে চিয়াংমাই শহরে। চারিদিকে আলোর ছ’টা। শহরটা বেশ ছিমছাম, রাস্তাঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। তেমন কোন ঘিঞ্জি এলাকা বা ঘনবসতি বস্তী এলাকা দেখলাম না। রাস্তায় চলাচলে গাড়ীর চালকও মোটর সাইকেল আরোহীরা বেশ নিয়ম মেনে চলে। গাড়ী চালকদের কোন হর্ন বাজাতে শুনিনি। অনেকটা মনে হলো পাশ্চাত্য কোন শহরের মতো কিন্তু তারপরও প্রাচ্যের শহর, আমার কাছে চিয়াংমাই শহরের অধিবাসীদের অনেক কাছের মানুষ মনে হয়েছে। দ্বিতীয়ত থাই অধিবাসীদের আমার মতো বৃহত্তর মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক বলে অনেক নৈকট্য অনুভব করেছি। মনে হয়েছে আমি বোধহয় তাদের একজন। ভাষাটা জানা থাকলে অতি সহজেই থাই সমাজে নিজেকে মানিয়ে নিতে তেমন কষ্ট হবে না মনে হলো।

 

সেদিন সন্ধ্যায় নাচ-গান হৈ হলুড় করে কেটে গেলো, বয়সের ভারে নূয়ে পড়লেও গান গাইতে হলো, নাচতে হলো সহ- প্রশিণার্থীদের সাথে। আমি গান পছন্দ করি। নাচও ভাল লাগে তাই অনেকটা মনের আনন্দে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। বয়সের ভার তো একটা আছেই সেটাতো আর ইচ্ছে করলেও ঝেড়ে ফেলতে পারি না। এই রেঁস্তোরাতে ব্যান্ড সঙ্গীত বেশ জনপ্রিয়। একজন থাই তরুনী বেশ সুন্দর করে পাশ্চাত্য সঙ্গীত পরিবেশন করছে। একটার পর একটা সে গান পরিবেশন করলো। একসময় আমি খোলা জায়গায় পায়চারি করছি। এমন সময় চোখে পড়লো দুইজন থাই রমনী ও দুজন থাই পুরুষ। তাদের সাথে স্বল্প আলাপে বুঝলাম এই রেঁস্তোরায় ব্যান্ড সঙ্গীতের একজন উৎসাহী শ্রোতা এবং আজকের সন্ধ্যায় আমাদের প্রশিনার্থীরা ব্যান্ড ফোর ব্যস্ত রাখায় তারা একটু বিরক্ত প্রকাশ করলো। থাই রমনী আমাকে তাদের সাথে অংশগ্রহণ করতে বললেন। এক পেগ উষ্ণ পানীয় পান করতে বললেন। আমি ভদ্রভাবে ধন্যবাদ জানালাম। পরে এক সময় এই চারজন আমাদের সাথে নাচে অংশগ্রহণ করেছে। থাই রমনী আমাকে জানতে চাইলো আমি কোন দেশের নাগরিক আমি সদুত্তর দিলাম। সে বললো যে আমাকে দেখতে চীনাদের মতো মনে হয়।

 

এক সময় রাত গভীর হওয়ার আগে আমরা কয়েকজন ফিরে আসলাম হোটেলে। এভাবে প্রশিণ কালীন দিনগুলি একসময় শেষ হতে চললো। প্রশিণ শেষ হওয়ার আগের দিন বিকাল বেলা কাস শেষ হওয়ার সময় আসন্ন। এই সময় আমাকে নিউউল্যান্ড থেকে আগত সহ-প্রশিণার্থী দয়ালু ও স্নেহ প্রবন সর্বজেষ্ঠ্যা মিস জর্জিনা এসে অনুরোধ করলো, যে আমাদের সমাপনী কাসে প্রার্থনা সভা পরিচালনা করবার জন্য। আমি রাজি হলাম। ভগবান বুদ্ধের আশির্বাদে ভাল করেই প্রার্থনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করলাম। আমরা সম্মেলন কে প্রশিক, শিার্থী ও অন্যান্য যারা ছিলেন সবাই হতে হাত ধরে গোল হয়ে দাঁড়ালাম। তখন আমি শুরু করলাম এই বলে যে, আজকের বিশ্ব সংঘাতময়। আমরা প্রার্থনা করবে পরম করুনাময়ের কাছে। যাতে তিনি এই করে উপস্থিত সকলকে এবং এই করে বাইরে যারা আছেন তাদের জীবনেও যাতে শান্তি বর্ষিত হয়। নিকের জন্য হলেও প্রার্থনা অনুষ্ঠান সবাইকে একটু নাড়া দিয়েছে। সবাই একটা মূহুর্ত্ব নীরবে প্রার্থনা করেছি আমরা। অনুষ্ঠান শেষে মিজেরাম থেকে আগত সহ- প্রশিণার্থী আমার মেয়ের বয়সী মারিয়া এসে ধন্যবাদ জানিয়ে করমর্দন করলো। শেষ দিন সকাল থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে আমার রুম মেটকে বললাম আজকে সন্ধ্যায় আমার বিদায়ের পালা। তবে পূর্ববর্তী রাতটা হোটেলের খোলা জায়গায় সুইমিং পুলের পাশে Farewell dinner followed by drink song and উধহপব খুবই আনন্দ হয়েছে, তরুন- তরুনীরা অনেকে নাচলো, সুইমিংপুলে জলকেলী করলো, গান করলো। আমি নাচে আর গেলাম না, গানেও নয় তবে মঞ্চে উঠে কারো কারো সাথে তাল মিলিয়েছি।

 

সবচাইতে চমৎকার ও সুন্দর আলাপ হয়েছে সেরেনা ও জেফের সাথে। সেরেনা বললো সে সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যাটা একটু আনন্দ ফুর্তিতে কাটাতে  চায়। তার সাথে এক টেবিলে বসে অনেকণ গল্প হয়েছে। সে বেশ অভিজ্ঞতায় ভরপুর। তার আমার মতো ঘর সংসার আছে। স্বামী, কন্যা, একবছর সে চীনের সাংহাই না কোন শহরে একটি গবেষনার কাজ করেছে। বললো সে ছোটকাল থেকে নাচতে ভালবাসে। তার মেয়ে ইউরোপীয় সঙ্গীতে একটা কোর্স করছে। সে নাচলো দেখলাম অনেকটা উচ্ছ্বল চঞ্চলা হরিনীর মতো। আমি উপভোগ করেছি তার নাচ। জেফের সাথেও বেশ গল্প হলো আমার মতো একটু উষ্ণ তরল পানীয় পান করেছে। অনেক কথার মাঝে এক সময় সে এমন মতামত দিল যে, অষ্ট্রেলিয়া একটা কমলওয়েলথভূক্ত প্রজাতন্ত্র হলেই ভালো। তার মতে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অষ্ট্রেলিযার রাষ্ট্রপ্রধান থাকার কোন অর্থই হয়না। এক সময় আমরা অনুষ্ঠান শেষ করলাম। নিজ নিজ কে ফিরে এলাম। আমার সহ- প্রশিনার্থী বার্মা থেকে আগত একজন আদিবাসী। তারা ও বর্মীদের হাতে নানাভাবে নিপীড়িত আমার অনুরোধে একদিন সন্ধ্যায় সে স্থানীয় একটি সুপার মার্কেট আমার কেনাকেটার সঙ্গী হয়। সুপার মার্কেট জম জমাট। খাবার দোকান থেকে শুরু করে আধুনিক বাদ্য যন্ত্র, মোবাইল, মানি এক্সচেঞ্জ সব সুবিধাই আছে।

 

প্রশিণ সমাপনীর দিন একসময় দরজার কাছে এসে নাঁড়া দিল। বিদায়ের দিন বিকালে প্রশিণ কে প্রত্যেক প্রশিনার্থীর প্রশিণ সম্পর্কে নিজ অনূভূতি ব্যক্ত করার পর এক সপ্তাহের অনুষ্ঠান শেষ হলো। আমি ৬০৭ নং কে চলে এলাম দ্রুত,  ৬ টার মধ্যে ক থেকে বেরিয়ে এলাম। হোটেল লবীতে বিদায় জানাতে এসেছেন আমার সপ্তাহব্যাপী সহ- শিার্থী খুমপো পো। কে এসেছিলেন ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের সহ- প্রশিনার্থী।

বিদায়ের মূহুর্তে কেমন জানি একটা বেদনার সুর সব সময় মনের গভীরে এসে বাজে। সেটা মনে হয় প্রতিটি মানুষের বিদায়  লগ্নে সহজাত অনুভূতি। হোটেল কর্তৃপ ইন্দোনেশিয়ার তরুন প্রশিনার্থী মি: মারাহ্ ও আমাকে বিমান বন্দরে পৌঁছানোর জন্য পিক-আপ ব্যবস্থা করে। আমরা ঠিক সময়ে বিমান বন্দরে পৌঁছলাম।

 

একসময় নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে কখন বিমান উড়াল ঘোষনা দেওয়া হবে তার অপোয় রইলাম। যথা সময়ে ঘোষনা দেওয়া হলো, মি: মারাহ থেকে বিদায় নিয়ে আবার আকাশ পথে ব্যাংকক, ব্যাংকক বিমান বন্দরে এসে লাগেজ বেল্ট থেকে ব্যাগটা নিয়ে বের হলাম। চোখে পড়লো আমার নাম কাগজে লিখে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুন। সে “আমনাধ” আমার স্নেহ ভাজন ছোট বোন চন্দ্রার গাড়ীর চালক। রাস্তা ঘাট ট্রাফিক কম থাকায় প্রায় ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম “চন্দ্রা” ও “জনের” সুখুমভিট এলাকায় নয় তলার ফ্যাট ভবনে। উনত্রিশ মার্চ সকাল সম্ভবত ১০টার পর ফ্যাট থেকে বেরিয়ে পড়লাম। চন্দ্রা তার চালককে গাড়ী সহ- পাঠিয়ে দিলো আমাকে ব্যাংকক শহরের দু- একটা দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখানোর জন্য।

 

“আমনাধ” ইংরেজী বুঝে এবং বলেও তবে জড়তা আছে। সে প্রথমে আমাকে ব্যাংকক শহরের সুবিখ্যাত ঞযব ঞবসঢ়ষব ড়ভ ঊসবৎধষফ ইঁফফযধ নামিয়ে দিল। অনেক পর্যটক দেখলাম। প্রবেশ মূল্য দিয়ে ভিতরে দর্শনীয় যা কিছু আছে তা দর্শনের অনুমতি নিতে হয়। স্মৃতি শক্তি বয়সের চাপে ধীরে ধীরে হ্রাসমান। মনে নেই দর্শনীয় কত থাই টাকা দিতে হয়েছিল। তবে কমপে দুইশত হবেই। ঊসবৎধষফ বৌদ্ধ মূর্তি দেখার জন্য পায়ের চটি জুতা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলাম। অনেক দর্শনার্থী। মন্দিরের পাশেই আর কয়েকটা দশর্নীয় স্থান দেখলাম। তার মধ্যে থাই রাজ প্রাসাদের কয়েকটা স্থাপনা, যুদ্ধাস্ত্র তারমধ্যে কিরিচ, বর্শা ইত্যাদি।

 

ঊসবৎধষফ মন্দিরের দেয়ালে অঙ্কিত থাই চিত্র- শিল্পীদের চমৎকার শৈল্পিক কাজ। প্রাচীন রামায়নের কাহিনীকে ভিত্তি করে এসব দেওয়াল চিত্র গুলি অঙ্কন করা হয়েছে। সময় কম থাকায় বেরিয়ে পড়লাম। ইতঃমধ্যে “আমনাধ” গাড়ী নিয়ে রাস্তার পাশে আমার অপোয়। ওকে বললাম চল আমরা দুজনে দুপুরের খাবার খাই। সে তার পরিচিত একটা সুপার মার্কেট নিয়ে গেল। গাড়ীটা নিরাপদে পার্ক করে আমরা মোটামুটি একটা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রেঁস্তোরাতে খাবার খেয়ে নিলাম। ইংরেজীতে যাকে  বলে ওয়ার্কিং লাঞ্চ সেরে নিলাম। আবার ঘুরে বেড়ানো আবার ও দুটা উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ মন্দির দর্শন করতে বের হলাম। এই মন্দিরে প্রবেশ মূল্য দিতে হয়নি। খুবই সুন্দর চমৎকার ভগবান বুদ্ধের শায়িত মূর্তি এই মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে। ইতিহাস বলে প্রাচীন ভারতে মল রাজাদের শালবনে কুশীনগরে আড়াই হাজার বছর আগে ভগবান বুদ্ধ শায়িত অবস্থায় মহা-পরি নির্বান লাভ করেন। সেই দৃশ্য কল্পনা করেই ভগবান বুদ্ধের এই মূর্তি গড়েছেন ভাস্কর। কোন ভাস্করের পে এই কাজ আসলে মনে ভক্তি শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা না থাকলে কখনও সম্ভব নয় এই ধরনের অপূর্ব সুন্দর মূর্তি গড়া।

 

অনেক দর্শনার্থীর মতো আমি ও বিশ বার্থ মূল্যের সমপরিমান এক বাটি মুদ্রা নিয়ে এক একটা মুদ্রা এক একটা পাত্র ফেলে তথাগত ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানালাম। আমাদের বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাস মতে দান, শীল, ভাবনা তিনটার সম্মেলন হলে একজন বৌদ্ধ ধর্মানুসারী নির্বান লাভের গতি পথ খূঁজে পেতে সম। একজন বিদেশী পর্যটককে অনুরোধ করলাম আমাকে একটা ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। সে সানন্দে রাজি হলো।

 

“আমনাধ” এবার নিয়ে চললো ব্যাংকক শহরের চাও প্রায়া নদীর তীরবর্তী ওয়াথ অরুন নামে আর একটা বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির দর্শনে। পঞ্চাশ বার্থ দর্শনীর বিনিময়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলাম। এই মন্দির স্থাপত্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। এর দেওয়ালের গায়ে বিভিন্ন মূর্তি  এবং উঁচু চূড়া এর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে।

 

মন্দিরের চূঁড়াতে উঠবার জন্য সোজা ও সংকীর্ণ সিঁড়ি আছে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম। মন্দিরের চূড়া থেকে নদীর তীরে ব্যংকক শহরের দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগে। আমি যদিও একা এই ভ্রমনে কিন্তু কোন কারনে আমার নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয়নি। কয়েকটা ছবি নিলাম ক্যামেরায়। আবার একসময় নীচে নেমে নদীর ঘাটে গিয়ে বসলাম। সম্ভবত ত্রিশ বার্থ দিয়ে একটা শীতল ডাব কিনে নিলাম। এই ঠান্ডা ডাবের পানি একজন তৃষ্ণার্থ পর্যটকের কাছে যেন ঔষধির মতো কাজ করে। এক সময় মন্দিরের নিকটে নদীর ঘাঠে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুণ। দেখি নদীর ঘাটের খুব কাছেই এক ঝাঁক মাছ সম্ভবত ক্যাট ফিস পানিতে ডুবছে আর ভাসছে। খাদ্যের সন্ধানে মাছগুলো নদীর তীরে এসেছে।

 

এক সময় বাসায় ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে আসলো। নদীর তীর থেকে আস্তে আস্তে ওয়াথ অরুন বা সূর্য্য মন্দির ছেড়ে অপেমান গাড়ীতে উঠলাম। তারপর দিন চললাম অযোধ্যায় তবে এই অযোধ্যায় দশরথ রাজা নেই, নেই রাম, লণ, সীতা, যারা রামায়ন মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র। তবে এই অযোধ্যায় নামটি অবশ্য রামায়ন থেকে নেওয়া। এখানে এক সময় থাই রাজারা রাজত্ব করতেন। রাজধানী ছিল কয়েকশত বছর আগে। থাই জাতীয় ইতিহাস মতে ১৩৫০- ১৭৬৭ এখানে রাজধানী ছিল। থাইল্যান্ডের প্রতিবেশী বর্তমান মায়ানমার বা ব্রক্ষ্ম দেশের রাজা ১৭৬৭ সলে ঈর্ষান্বিত হয়ে এই রাজধানী শহর আক্রমন করেন। থাই রাজকে  পরাজিত করেন।

 

মিঃ অদি থাই ট্যুর গাইড বললো যে, বিজিত রাজ্যে মৃত্যু বরণ করেন বার্মার রাজা। এখানে “ওয়াথ ফরা শ্রী সনপেথ”নামে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে। ১৯৯১ সাল থেকে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো এই  প্রাচীন মন্দিরটিকে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে। এই ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষের পাশে বৌদ্ধ মন্দিরে আছে থাইল্যান্ডের সর্ববৃহৎ ব্র্যোঞ্জি নির্মিত বুদ্ধ মুর্তি। ট্যুরগাইড অনর্গল বলে যাচ্ছেন এর ইতিহাস আর আমরা একান্ত বাধ্যগত শ্রোতা। মন্দির সংলগ্ন অনেকগুলি দোকান দেখলাম, পর্যটকদের আকর্ষন করার মতো নানান দ্রব্য সামগ্রী পাশে কিছু খাবার দোকানও দেখলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল দুএকটা নুতন খাবারের স্বাদ নেবার কিন্তু দলছুট হবার কোন সুযোগ নেই। মনের ইচ্ছে মনের গভীরে চেপে রাখলাম।

 

তারপরে আবার বাসে উঠে নিকট দূরত্বে আমরা চললাম ১৩৫৭ সালে রাজা- উ-মং নির্মিত “ওয়াথ আই ছায় মঙ্কোল’ বৌদ্ধ মন্দির দর্শনে। এর পাশেই শায়িত অবস্থায় ভগবান বুদ্ধের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। কিছূ পূন্যার্থী দেখলাম এখানে পূণ্যলাভে এসেছেন। এক পলকে যেটুকু সম্ভব তাই দেখলাম। রণ সাজে সজ্জিত এক রাজার যুদ্ধং দেহী মূর্তি একটু উঁচু বেদীতে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথে দুজন থাই ভদ্রলোক দেখলাম, একজনকে অনুরোধ করলাম আমার  ক্যামেরায় একটি ছবি তুলবার জন্য। আস্তে আস্তে সূর্য্যের তাপ বাড়ছে একটু একটু কান্তিও লাগছে। তারপরও চলতে হবে, দেখতে হবে পর্যটকদের মূলমন্ত্র জপ করে বাসে উঠলাম। তখন ঘড়িতে ১১টা বেজে গেছে। বাস এসে পৌঁছালো রাজ প্রাসাদ বাঙ-পা ইন। রাজা প্রাসাদ থঙ’ ১৬৩২ সালে এই রাজ প্রাসাদ নির্মান করেন। এই পলী প্রাসাদটি এই এলাকায় নির্মিত রাজা পঞ্চম রামের আমল থেকে গ্রীষ্ম নিবাস হিসাবে রাজারা ব্যবহার করছেন। উলেখ্য থাই রাজারা রাম উপাধি হিসাবে লিখে থাকেন। যেমন- বর্তমান রাজা ভূমিবল আদলাই দেজ- নবম রাম নামেই পরিচিত সরকারীভাবে।

 

এই বাঙ- পা- ইন রাজ উদ্যানটি চলিশ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। এখানে বেশ কয়েকটি রাজ ভবন আছে। পাশ্চাত্য স্থাপত্য আদলেই অধিকাংশ রাজ ভবনগুলি নির্মিত। থাই ইতিহাসে যতদূর জানা যায় সপ্তদশ শতাব্দীতে এর ভিত্তি নির্মান শুরু হয়। রাজা একাতোথসরথ (১৬০৫- ১৬১০/ ১১ খৃঃ) এর পুত্র রাজা প্রাসাদ থঙ এখানে ওয়াথ চুমফোন নিকায়ারাম নামে প্রথমে একটি বৌদ্ধ মন্দির নির্মান করেন। পরবর্ত্তীতে রাজা নারাই, রাজা মঙ্কুট ১৮৫১- ১৮৬৮) রাজা চুলালংকরণ (১৮৬৮- ১৯১০) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভবন গুলি নির্মান করেন। তবে অধিকাংশ ভবনগুলি ১৮৭২ থেকে ১৮৮৯ সালের মধ্যে নির্মিত।

 

তবে বর্তমানে রাজা ভূমিবল আদলাইদেজ (রাম- নবম) এবং রানী সিরিকিত রাজকীয় কোন অনুষ্ঠানে আয়োজনে বা বিশেষ অতিথি আপ্যায়নে এই বাঙ পাইন রাজ প্রাসাদ ব্যবহার করে থাকেন। চীন দেশীয় স্থাপত্য শিল্প রিতীতে নির্মিত ‘ফ্রাথিনাঙ’ (রাজভবন) ওয়েহার্ট চমবরুন (স্বর্গীয় তালে) বেশ চমকপ্রদ একটি ভবন। এই ভবনে ভিতরে দেখতে হলো জুতা বাইরে রেখে যাওয়ার নিয়ম। তাই করলাম আমরা কয়েকজন। তখনকার চৈনিক ব্যবসায়ীরা এই প্রাসাদ চৈনিক নির্মান করে ১৮৮৯ সালে রাজা চুলালংকরণকে উপহার দেন। এই রাজ প্রাসাদের ভিতরে দরজা জানালা সাজ- সজ্জা প্রচুর শৈল্পিক কাজ। এর নির্মানে প্রচুর স্বর্ণ, রৌপ্য ব্যবহৃত হয়েছে।

 

ঘড়ির কাঁটা থেমে নেই, আমরা যথাসময়ে রাজ উদ্যান দর্শন করে বেড়িয়ে এলাম। আবার বাসে উঠলাম। এর চলিশ মিনিট পর ‘চাও কইয়া’ নদীর ঘাটে পৌঁছালাম। সেখানে অপেমান নৌযান। ময়ূর পঙ্খী হয়তো নয় তবে সাজ- সজ্জায় আরামে  আয়সে আধুনিক একটি নৌযান বলতে হবে। আমাদের ট্যুর গাইড মিঃ আদি এতই পারদর্শী এবং সময় সচেতন যে, কথায় আচার আচরনে একজন দ গাইড ন্বীকার করতেই হয়।

 

পর্যটকদের নৌযানে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই ইঞ্জিন চালু করা হয়। নদীর দুই পারের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা নদীর ভাটী অঞ্চলে ব্যংককের দিকে চললাম। আসলে নুতন জায়গায় ভ্রমন করতে এলে সবকিছু নুতন লাগে। সবকিছু দু’চোখ ভরে দেখতে ইচ্ছা হয়। প্রায় আড়াই ঘন্টা নৌবিহার শেষে বেলা ৩.৩০ ব্যাংককের একটা নির্দিষ্ট ঘাটে এসে নৌযান থামলো। গাইড ঘাটে এসেই ভদ্রভাবে তার ছেলেমেয়েদের কথা বলে কিছু বকশিস চাইলো। আমি পঞ্চাশ বাথের একখানা নোট তাকে দিলাম সে ধন্যবাদ জানালো আমাকে।

 

৩১শে মার্চ সকালে সাতটায় ড্রাইভার গাইড সহ আমরা সাতজন পর্যটক। আমাকে মাইক্রোবাসে উঠার পর পরবর্তী হোটেলে গাড়ী এসে, ট্যুর গাইড আমার কাচে মা চেয়ে বললো যে, আজকে আমাদের পাতথাইয়া যাওযা হচ্ছে না। আগামীকাল পাতথাইয়া ভ্রমন। আমি ইচ্ছে করলে মাত্র আটশত থাই টাকা দিয়ে আমি কাঞ্চনাবুড়ী যেতে পারি। আমি রাজি হয়ে গেলাম। ব্যাংকক থেকে দণি- পশ্চিমে বর্মী সীমান্ত এলাকায় কাঞ্চনাবুড়ী প্রদেশের অবস্থান। প্রায় তিন ঘন্টা মাইক্রোবাস চলার পর কাঞ্চনাবুড়ী শহরে এসে পৌঁছালাম।

গাড়ী এসে থামলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নিহত হাজারো সৈনিকের স্মৃতি সমাধি স্থলে, ট্যুর গাইড গাড়ী থেকে নেমেই বললো মাত্র আধ ঘন্টা সময় বাঁধা আছে এ সমাধি দেখার জন্য। সমাধি স্থলে সারি সারি হাজার হাজার সৈনিকের স্মৃতি ফলকে নাম ঠিকানা খোদাই আছে এক একজন সৈনিকের সমাধিতে। কিছুণের জন্য হলেও মনটা ভারাক্রান্ত হয় যারা যুদ্ধে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্য তারাইতো এক একজন দেশপ্রেমিক। জীবন বিসর্জন দিয়ে তার প্রমান রেখে গেছেন তারা।

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে এশিয়া মহাদেশে সামরিক দিক থেকে জাপানের অভিযান ঠেকানো সেই সময় বৃটিশদের পে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ফিলিপাইন থেকে শুরু করে জাপানী সৈনিকরা একে একে ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, চীনের তাইওয়ান, একেবারে আমাদের দোর গোড়ায় বার্মা, মনিপুরের রাজধানী ইম্ফল পর্যন্ত এসে পৌঁছে গিয়েছিল।

 

যথাসময়ে স্মৃতি সমাধি স্থল থেকে বের হলাম সমাধিস্থল থেকে কিঞ্চিৎ দূরে JEATH (Japan, England, America & Australia, Thailand & Holland) WAR MUSEUM ডঅজ গটঝঊটগ বা যুদ্ধ যাদুঘর দেখতে গেলাম। যাদুঘরটি শনের এবং বাঁশ দিয়ে তৈরী একটা সাধারণ মাচাং ঘর। বাঁশের তৈরী যাদুঘরটি সেই সময় যুদ্ধবন্দীরা যেভাবে বন্দী অবস্থায় বাঁশের তৈরী কুটীরে বাস করতো তার নমুনাই তৈরী করা হয়েছে। এই কুটীতে যুদ্ধ বন্দীদের সেই সময়ের অনেক ছবি, কিছু আগ্নেয়াস্ত্র যেমন পিস্তল, বোমা, বন্দুক ইত্যাদি সঙতেœ সংরণ করা হচ্ছে।

 

ছবিগুলি দেখলে বুঝা যায় সেই সময়ে যুদ্ধবন্দী সৈনিকরা কি অমানসিক পরিশ্রম ও অমানবিক ব্যবহারের শিকার হয়েছিল জাপানীদের হাতে। ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৯৪২ সালে এই রেলপথ নির্মান শুরু হয়। ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, বার্মা, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ড থেকে সংগৃহীত প্রায় দুই ল শ্রমিককে এই Death Railway বা মৃত্যু রেলপথ নির্মানে শ্রমিক হিসাবে কাজে বাধ্য করা হয়। এর মধ্যে একল শ্রমিক এবং ষোল হাজার যুদ্ধবন্দী সৈনিক খাদ্যভাবে, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু বরন করেন। জাপানী প্রকৌশলীরা ভবিষ্যতবানী করেছিলেন যে, এই রেলপথ তৈরী করতে কমপে পাঁচ বছর সময় লাগবে। কিন্তু জাপানী সামরিক বাহিনী মাত্র ষোল মাসে এই রেলপথ তৈরী শেষ করতে বাধ্য করে যুদ্ধ বন্দীদের। ২৫শে ডিসেম্বর ১৯৪৩ সালে এই রেলপথ তৈরী সমাপ্ত হয়। যুদ্ধ কি ভয়ঙ্কর? যাদুঘর দেখা শেষ করে আমরা এর নিকটেই সেই বিখ্যাত সেতু দেখতে গেলাম। অনেক বিদেশী পর্যটক রেল সেতু হেঁটে পার হয়ে ওপারে যাচ্ছে। আমরা কয়েকজন সেতুর ওপারে গেলাম। ছবি নিলাম ক্যামেরায়। সেতুর ওপর একজন বেহেলা বাদক সেই ইংরেজ সঙ্গীতটি করুন সুরে বাজিয়ে শুনাচ্ছে পর্যটকদের। পর্যটকরা কেউ কেউ বেহালা বাদককে বার্থ বা থাই মুদ্রা দিচ্ছে। আমি পাঁচ বার্থের একটা মুদ্রা তাকে দিলাম। কিশোর বয়সে চট্টগ্রাম শহরে Bridge on the River khaw’ একটি চমৎকার ইংরেজী ছবি দেখেছিলাম। সেই ঐতিহাসিক ব্রীজ দেখতে এলাম আজ।

 

একসময় ট্রেন এসে থামলো ছোট ষ্টেশনে অনেকটা তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লাম ট্রেনে। আমাদের ট্যুর গাইডের নির্দেশমতো নির্ধারিত আসনে বসলাম। সেতু পেরিয়ে ট্রেন চললো প্রায় ঘন্টা দেড়েক। রেলপথে দুপাশে কৃষিখামার। রেলপথের দুপাশে গ্রামে লোকজন তেমন দেখা যায় না বললেই হয়। তেমন ঘনবসতি নয় গ্রামগুলো। একসময় ট্রেন এসে থামলো একটা ষ্টেশনে। আমরা নেমে পড়লাম যাত্রীরা। ট্রেন থেকে নেমে আবার মাইক্রোবাসে উঠলাম। মাইক্রোবাসে খোয়াই নদীর পারে পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত এক রেঁস্তোরায় এসে থামলো। আমরা দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। খাবার ভালই। খাবার খেয়ে আবার উঠলাম মাইক্রোবাসে। আমরা এবার হাতির পিঠে চড়লাম। এখানে হাতি পিঠে চড়বার জন্য একটা দাম দিতে হয়। আমার সহযাত্রী একজন আমার সমবয়সী ইউরোপীয় ফরাসী ভদ্রলোক। হাতির পিঠে চড়ে মনে হলো উড়োজাহাজ, মাইক্রোবাসে চড়ে যে আরাম বোধ করেছি তার তুলনাই অনেকটা শাস্তি পাওয়ার মত। হাতির চালক বর্মী বা মইনামার ভাষায় কথা বলে। সহযাত্রী হাতির চালককে জিজ্ঞেস করে হাতির বয়স কত? হাতির চালকরা এমন পারদর্শী যে হাতিকে এমনভাবে প্রশিণ দিয়েছে যে প্রথমে খোয়াই নদীতে নামালো আমাদের। তারপর এখান থেকে উঠিয়ে আবার চড়াই ডিঙ্গিয়ে একটা খোলা মাঠে। তারপর নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসলাম। আর দুটি হাতি দেখলাম এভাবে পর্যটকদের পিঠে নিয়ে ঘুরছে। সেদিন তাপমাত্রা বেশী থাকায় তেমন ভালো লাগেনি। এবার আমাদের দেখানো হলো “ “Tiger Temple” ”

 

যা দেখলাম তাতে অবাক হবার কিছুই নেই। তিন চারটি বাঘকে ধরে বেঁধে রেখেছে। জনা চারেক লোক। এছাড়া দুজন ভিু দেখলাম। পর্যটকরা বাঘের পাশে বসে ছবি তুললেন অনেকে। বাঘের হুংকার নেই, পোষা বাঘ। তবে ঝিমিয়ে আছে মনে হলো বন্দী বাঘগুলো। আমার ক্যামেরা ফিল্ম কার্ড পারপূর্ণ হওয়ায় আর ছবি তুলা সম্ভব হলো না। ফরসি ভদ্রলোক দুই একটা ছবি তুললেন বাঘের পাশে বসে। ফিরে আসবার সময় হলো। ট্যুর গাইড বেশ সময় সচেতন এবং পর্যটকদের গাড়ীতে ফিরে আসবার সময় হলেই স্মরন করিয়ে দেন তাৎনিকভাবে। টাইগার পার্কে বেরিয়ে আসবার সময় ট্যুর গাইড কৌতুক করে বললো যে ঘরে তারও দুটা বাঘের বাচ্চা আছে  যাদের তার সময় মতো খাবার দিতে হয়। তার দুটা ছেলে আছে বাসায়।

 

ফিরে আসার সময় হলো। মাইক্রো বাসে উঠলাম আবার। ব্যাংকক পৌঁছতে আমাদের রাত হলো। রাত ৭টা বেজে গেলো। আমাদের যে এলাকায় অবস্থান ট্রাফিক জ্যাম্পের কারনে সে ঐলাকায় গাড়ী পৌঁছতে অনেক দেরী হবে তাই এক সময় আমরা মনো রেল ষ্টেশনে নামলাম। আমরা মনো রেলে চড়ে আমাদের যার যার গন্তব্যে ফিরে আসলাম। বাসায় পৌঁছে স্নান সেরে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম।। তারপর দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু হলো “পাতথাইয়া” সাগরের উপকুলে নির্ধারিত জায়গা হতে যথারীতি মাইক্রোবাস চলল “Pattya” সাগর উপকূলের পথে। যাত্রী শুধু আমরা দুজন। ছবি রানাবত, একজন নেপালী। চালক, গাইডসহ আমরা মাত্র চারজন চলছি ,শ্যাম উপসাগরে Pattya Beach দর্শনে। ঘন্টা তিনেক ভ্রমনের পর আমাদের মাইক্রোবাস এসে থামলো শ্যাম উপসাগরের বালুকাময় বেলাভূমিতে। গাড়ী থেকে নামতেই আমাদের অপোয় একজন গাইড। পরিচয় হলো, নাম তার রাপ্তি। আধ ঘন্টার মধ্যে আমাদের সাথে যোগ দিলো দুই সন্তান সহ ভারতীয় দম্পত্তি। মিস্ রাপ্তি, আমাদের ছয়জনের জন্য ছয়টা নীল রঙের লাইফ জেকেট দিয়ে বললো  সময় কম তাড়াতাড়ি জেকেট পরে নিন। এখনি উঠতে হবে আমাদের স্পীড বোটে। যথা নির্দেশ মতো আমরা সমুদ্র নিরাপদ ভ্রমন উদ্দেশ্য লাইফ জেকেট পড়ে নিলাম। একশ বিশ অশ্বশক্তির খুবই দ্রতগামী স্পীড বোটে উঠলাম। স্পীড বোটে চলতে শুরু করলো প্রায় পনের মিনিট। মাঝ পথে একটা ভাসমান পাটফর্ম এসে বোট এসে ভিড়লো। বোট থেকে নেমে পাটফর্মে উঠলাম আমরা। কিছু পর্যটক দেখলাম সেখান থেকে রঙ বেরঙের প্যারাসুটের জড়িয়ে আকাশ ভ্রমন করছে। দুইটা দ্রুতগামী স্পীড বোর্ড পর্যটকদের বাতাসের অনুকুলে দ্রুত চালিয়ে অল্পন উঁচুতে উঠিয়ে টেনে নিয়ে যায়। আমরা আকাশ ভ্রমনে অভিযানে ইচ্ছুক না- হওয়ায় আবার উঠলাম স্পীড বোটে। বোটে চললো “হেইহিন” নামে একটা ছোট দ্বীপে। বালুকাময় বেলাভূমিতে সমুদ্র স্নান করছে অনেক পর্যটক। আমাদের দলটি বালুকাময় বীচের কাছেই স্বচ্ছ নীল সমুদ্রের পায়ের গোড়ালী সমান পানিতে বোট থেকে নামলাম। সমুদ্র স্নান করবার জন্য একটা শর্টস পরে নিলাম উপক’লের একটা নির্ধারিত জায়গায়। পর্যটকদের সুবিধার জন্য সেখানে শৌচগার সুবিধা ব্যবস্থা আছে তবে বিনা মূল্যে নয়।

 

অল্পন পরে সমুদ্র স্নানে নেমে পড়লাম। সমুদ্রের পানি এত নীল ও স্বচ্ছ তা না দেখলে অজানাই থেকে যেতো। পর্যটকদের ভীড়ের মাঝে আমি শ্যাম উপসাগরের নীল জলে কিছুন সাঁতার কাটলাম। এক সময়ে তীর উঠে আসলাম। আমাদের দলের গাইড মিস: রাপ্তি দুপুরের খাবারের জন্য একটা নেপালী রেঁস্তোরায় আমাদের লাঞ্চের আয়োজন  করে। দুটার সময় আবার স্পীড বোটে আমাদের দলকে দ্বীপ থেকে নিয়ে আসা হলো তীরে। এবার বিদায় নিলাম ভারতীয় পরিবারটির থেকে। ইতিমধ্যে গাইড মাইক্রোবাস নিয়ে আমাদের অপোয়। বাসে উঠে পড়লাম। শহরের এক প্রান্তে মাইক্রোবাস এসে থামলো। গাইডের কথা মত আমরা দুজন নেমে পড়লাম। গাইড বললো এখানে পর্যটকদের বিনা মূল্যে কৃত্রিমভাবে মূল্যবান পাথর কিভাবে খনি থেকে আহরন করা হয় তা দর্শনের ব্যবস্থা আছে। প্রথমে প্রবেশ পথের প্রত্যেক পর্যটককে ছোট গাসে বিনা মূল্যে ঠান্ডা পানীয় আবার সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসার পর পর্যটকদের কফি পরিবেশন করা হয়। তবে এর পাশেই ভবনে মূল্যবান পাথর দিয়ে নানা ধরনের রমনীদের সাজ সজ্জার অলংকার তৈরীর কারখানা এবং শো-রুম। বিশেষ করে মহিলা পর্যটকদের আকর্ষন করার মত রঙ- বেরঙের মূল্যবান পাথর খচিত নানা ধরনের স্বর্নালংকার বিক্রি হচ্ছে। ছবি রানাবতসহ আমরা দুজনে ঘুরে দেখলাম। পাথরের যে মূল্য লেখা আছে তা আমার ক্রয় মতার বাইরে। তারপরও নগদ তিনশত বার্থমূল্যে একটা দুইরত্তি ওজনের সিটরন পাথর কিনলাম।

 

একসময় বেরিয়ে পড়লাম সেখান থেকে। সেইদিন সন্ধ্যার আগেই ব্যাংকক ফিরে আসলাম। তার পরদিন সকালের প্রাতরাশ সেরে বোন চন্দ্রা, তার স্বামী ও ছোট খুকী পিয়া সারাহ্ থেকে বিদায় নিলাম। আমার সহযাত্রী এবার আমার ভ্রাতুষপুত্রী রাজা দেবাশীষের কন্যা আয়েত্রী। সে ব্যাংককে একটা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিগত কয়েক বছর থেকে পড়াশুনা করছে। পড়াশুনায় ভালো ও একজন মেধাবী ছাত্রী। চন্দ্রার গাড়ীর চালক “আমনাধ” যথাসময়ে সুবর্ণভূমি বিমান বন্দরে এসে থামলো, আয়েত্রী সহ নেমে পড়লাম গাড়ী থেকে। বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিমানের নির্ধারিত আসনে বসলাম। বিমান এবার ঢাকার পথে। বিদেশ ভ্রমনের পর স্বদেশ ফিরে আসবার সে এক আলাদা অনুভূতি। এক সময় বিমান ঢাকা শাহ্জালাল বিমান বন্দরে এসে থেমে গেলো স্বদেশের মাটিতে ফিরে এলাম। ঢাকা থেকে তারপর দিন রেলগাড়ীতে চট্টগ্রাম তারপর দিন চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের শৈলময় রাঙ্গামাটি। যেখানে আমার স্থায়ী নিবাস ও কর্মস্থল। এই কয়দিন বিদেশে আনন্দময় সময় কাটিয়ে আবার কর্মব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সেই ব্যস্ততা কখন থামবে তার সঠিক সময় আমার জানা নেই!!

এই বিভাগের আরো পোস্ট

Tags: