কবি মৃত্তিকা চাকমা প্রায় সময় বলতো মনোজ দা একজন আদিবাসী সংগীত শিল্পী হিসেবে তোমার তিল তিল করে নিজকে গড়ে তোলা, বিভিন্ন বাধা বিপত্তিকে ডিঙিয়ে আদিবাসী সংগীতকে নিয়ে এগিয়ে চলার অভিজ্ঞতা গুলো প্রকাশিত হলে আগামী প্রজন্ম উপকৃত হতো। তার কথা মত আমার স্মৃতিতে এখনো যে সব কথা জমা রয়েছে সে সব কথা গুলো সাজিয়ে গুছিয়ে লেখার একটা উদ্যোগ নিয়েছি। এ লেখাটি তারই ফসল। আসলে লেখা লেখি বিষয়টা আমার কাছে একটু কঠিন। আমি গানের লোক। ছোট ভাই মৃত্তিকার উৎসাহে এর আগে আমার স্মৃতি কথা নামে ২/১টি লেখা লিখেছিলাম তারই ধারাবাহিকতায় এ লেখাটি লেখার প্রয়াস। তার মনের কথাটি উপলব্ধি করেই এই লেখাটি শুরু করছি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি তথা আদিবাসী সংস্কৃতির বিকাশ ও সংরনের জন্য একজন ুদ্র কর্মী হিসেবে সেই ছোট কাল থেকে আমার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। কারো কোন প্রশংসা পাওয়ার জন্য আমি অপো করি নি। আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় প্রয়াত সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা অনেক আদর্শিক কথার মধ্যে আমায় প্রায় সময় বলতেন মনোজ তোমার কাজ তুমি করে যাও ভালো মন্দ বিচারের ভার সৃষ্টি কর্তার, তোমার উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়ে থাকে তবে পুরস্কার তুমি অবশ্যই পাবে। আমি মনে প্রানে সে সব কথা বিশ্বাস করেছি।
আমি যাদের সান্নিধ্যে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি আজ আমি সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি তাদের। তারা হলেন প্রয়াত নৃত্য শিক জনাব দেলোয়ার হোসেন, সুকন্ঠী গায়ক প্রয়াত বিমলেন্দু দেওয়ান, সংগীত শিক প্রয়াত সুনীতি রঞ্জন বড়–য়া,প্রয়াত কল্যান মিত্র বড়–য়া,প্রয়াত অনন্ত চৌধুরী, প্রয়াত অমিতাভ বড়–য়া,দিলীপ দাশগুপ্ত, হিমাংশু বিমল দাশ মহোদয় গন সহ আরো অনেককে।
আমি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি এসডিও অফিসে চাকুরী করেছিলাম। খাগড়াছড়ি মহকুমা জেলা ঘোষিত হওয়ায় ১৯৮২ সনের জুন মাসের ২২ তারিখে আমি রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলী হয়ে আসি। তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন প্রয়াত জনাব আলী হায়দার খান ইপিসিএস । খাগড়াছড়িতে থাকা কালীন আমি প্রয়াত শ্রদ্ধেয় নবীন কুমার ত্রিপুরার সান্নিধ্য লাভ করি। তিনি অনেক বড় মাপের একজন সংস্কৃতি প্রেমী ছিলেন। তার সহায়তায় খাগড়াছড়িতে আমি অনেক কাজ করেছিলাম। মহকুমা প্রশাসকের অফিসে চাকুরী করার সুবাদে আমি খাগড়াছড়ি শিল্পকলা একাডেমীর দ্বায়িত্ব পাই। তখনকার আরেক নাটক পাগল ব্যক্তি জনাব ইব্রাহিম খাঁ এর পরিচালনায় তখন খাগড়াছড়ি টাউন হলে বানিজ্যিক ভাবে নাটক মঞ্চায়িত হয়েছিল। শ্রী কল্যান মিত্রের চোরা গলি মন,আসকার ইবনে শাইক এর ফকির মজনু শাহ ইত্যাদি নাটক আমার তত্বাবধানে অভিনীত হয়েছিল। চট্টগ্রামের তথনকার নামী দামী অভিনেত্রীদের এনে আমি নাটক গুলো মঞ্চায়িত করেছিলাম। মহাজন পাড়ার সূর্যশিখা শিলপী সংঘ, খাগড়াছড়ি বাজারের কিশোর সংঘ ইত্যাদি সংগঠন গুলোর সাথে আমি নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে সংস্কৃতি চর্চায় সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। আমি একজন সংগীত প্রশিক হিসেবে আমার অনেক ছাত্র ছাত্রী তৈরি করেছিলাম । তাদের মধ্যে শ্রদ্ধেয় নবীন বাবুর দুই কন্যা রিতা ত্রিপুরা,মিতা ত্রিপুরা,সহ সিসিলিয়া,মার্চেলিনা, ও মিস্টার কাসেমের কথা মনে পড়ে। এই কয়েকজনের নাম স্মরণে আছে বাকীদের নাম মনে নেই।
রাঙ্গামাটিতে যোগদানের পর পরই একদিন শ্রদ্ধেয় অশোক কুমার দেওয়ান তখনকার উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের পরিচালক আমায় ডেকে পাঠালেন। আমি তার সাথে সাাৎ করলাম। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতায় আমাকে সংস্কৃতি বিষয়ক তার মনের কথা ব্যক্ত করলেন। তিনি আমাকে অনুরোধ জানালেন আমি যাতে তাঁকে সহায়তা করি। আমি তার কথায় নিজেকে সম্মান্বিত বোধ করলাম ভালো লাগলো তার আন্তরিকতা ও আমার প্রতি তার আস্থার জন্য। আমি তখন আমার চাকুরী স্থল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে এ বিষয়ে একটি অনুমতি পত্র নিয়ে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের খন্ডকালীন উপজাতীয় সংগীত শিক হিসেবে যোগদান করলাম। অফিস ছুটির পর অর্থাৎ ৫টার পর আমি বর্তমার জেলা শিা অফিসের বিপরীতে যে ভবনটি আছে সেখানে কাশ করাতাম। বর্তমানে সংগীত জগতে যারা পরিচিত সে সব প্রায় সকল শিল্পীরাই আমার ছাত্র ছাত্রী ছিল। এ মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে বাচ্চু চাকমা,জয়তী চাকমা,অমরজ্যোতি চাকমা,পঠন চাকমা,সুব্রত চাকমা দেরকে।
আরো অনেকেই আমার সান্নিধ্যে থেকে আজ সংগীত লাইনে প্রতিষঠা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রনেশ্বর বড়–য়া,আলী হোসেন,দিলীপ বাহাদুর,পংকজ বাহাদুর,প্রদীপ বাহাদুর লালে,শিমুল দাশ,স্বপন দাশ অন্যতম। সময়ের ব্যবধানে আমি অনেক তথ্য ভুলেও গেছি আবার এমন অনেকের কথা লিখতেও চাই না পাছে তারা যদি অস্বীকার করে । আমি এমন কিছু তথাকথিত স্টারদের জানি যারা প্রতিভা থাকা সত্বেও শুধুমাত্র শিক তথা শিা গুরুকে অস্বীকার বা অসম্মান করার কারণে সংগীত জগৎ থেকে ছিটকে পড়েছে। আমি মনে করি সংগীত একটি আরাধনা। অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে এই বিষয়টিকে গ্রহণ করতে হয়। কোন অনিয়ম বা অন্যায় কিছু সংঘঠিত হলে এর ফল আপনা আপনি ঘটে যায় । এটি রোধ করা তখন আর কারো পইে সম্ভব থাকে না। তবে এত কিছু ভেবে কেউ কি সংগীত চর্চা করে? আমি আমার একটি বিশ্বাসের কথা বললাম মাত্র। বিষয়টি কে কিভাবে নেবে সেটি পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।
আমি ১৯৭৬ সনে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে কন্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকা ভূক্ত হই। তখন অডিশন হতো কন্ঠ পরীা নামে। অডিশনে একটি তানপুরা ও একজোড়া তবলা ছাড়া আর কোন বাদ্যযন্ত্র ছিল না। প্রথমে তানপুরার সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বিভিন্ন তালে সারেগামা করা সহ নানা প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছিল। এর পর আমি বাংলা ভাষায় রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, ও চাকমা গান পরিবেশন করি। তখন পরীক ছিলেন সর্ব শ্রদ্ধেয় আবু নাঈম,রনজিত বরন চৌধুরী,রঙ্গলাল দেব চৌধুরী,আনোয়ার মুফতি। যতদূর মনে পড়ে তখন আর ডি ছিলেন মোবারক হোসেন খান। অডিশনে আমি পাশ করি এবং আমাকে পার্বত্য আদিবাসী শিল্পী হিসেবে চাকমা গানের জন্য নিয়মিত প্রোগ্রাম দেয়া হতে থাকে। আমি নিয়মিত প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণ করতে থাকি।
তখন আদিবাসীদের মধ্যে গান রচনা করা সুর করার মত হাতে গোনা দু একজন ছিলেন। কিন্তু তাদের পে প্রতি মাসে আমার জন্য গান তৈরি করে দেয়া সহজ ছিল না। বাধ্য হয়ে আমি নিজেই গান লেখা ও সুর করা আরম্ভ করলাম। সাথে সাথে আমার বন্ধুদের বললাম গান বা কবিতা জাতীয় কিছু লিখতে যাতে আমি সেগুলোকে গান বানাতে পারি। তাদের মধ্যে রিপন চাকমা,সুশান্ত চাকমা পিন্টু অন্যতম।
আমি তাদের বহু গান সুর করে গেয়েছি। এর পর আমি গীতিকার হিসেবে পেয়েছি সুগত চাকমা,অমর শান্তি চাকমা,সঞ্জয় চাকমা,মৃত্তিকা চাকমা, জগৎজ্যোতি চাকমা, ডাঃ ভগদত্ত খীসা, মুজিবুল হক বুলবুল সহ আরো অনেককে। তখন বর্তমান সময়ের মত টেলিভিশন ছিল না । রেডিও ছিল একমাত্র প্রচার মাধ্যম । রেডিও তে গান করার সুবাদে আমি একজন কন্ঠ শিলাপী হিসেবে পরিচিত লাভ করি। তাই রেডিও কে আজো আমি সম্মান করি ভালোবাসি। রাঙ্গামাটি বেতার কেন্দ্রের শুরু থেকেই আমি জড়িত থেকেছি। যখনি আমাকে কোন প্রোগ্রাম দেয়া হয় আমি আমার জরুরী অনেক কাজ বাদ দিয়ে রেডিওতে ছুটে যাই। রাঙ্গামাটি বেতার কেন্দ্রের সকল সদস্যকে আমি সম্মান করি তাদের আপন জন বলে মনে করি। বর্তমানে আমি বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রের খন্ডকালীন সংগীত প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার সুর করা চট্টগ্রাম বেতারে রেকর্ডকৃত কিছু পুরানো ও জনপ্রিয় চাকমা/তঞ্চঙ্যা গানের তালিকা নিম্নে তুলে ধরলাম।
ক্রঃ গানের কথা গীতিকার
১ যুদি ফিরি এদ সেই পুরানা দিনুন/অহদুং আগাজর পেক /উড়ি উড়ি বেড়েদুং ম দেজর আগাজত রিপন চাকমা।
২ অহবে যুদি লাঙুনি,শুন মর পরানি পিন তুই পিননান বুগত বেরেই হাদিয়ান সুশান্ত চাকমা।
৩ ও মর পরানি,কুদু যর কনা মুই ও যেম ত লগে মরে দাগি ল না সুশান্ত চাকমা।
৪ এই জিংগানিত তরে যদি ন পাং ও পরান বি কোন দিন পুরি ন ফেলেচ সুশান্ত চাকমা।
৫ গেংখুলী তুলি ল বাজাব্যু, এ দেজত থেদং নয়,এ কালত রদং নয় সুগত চাকমা।
৬ আহ্দি যাদে পদে পদে একদিন/পদমায় মুই থিয়েলুং/রিনি চেলুং পিজিনে তুই নেই সুগত চাকমা।
৭ কৃষ্ণচুড়া রঙে পত্থান রাঙেইয়ে/দোল জিংগানি কুদু যেন নেযেইয়ে সুগত চাকমা।
৮ ভিন পারাল্যা বউ চেলে বুক জলে মর মন জলে ও লাঙুনি মর সমারে ঘর ছারি কি লামিবে ডাঃ ভগদত্ত খীসা
৯ ভালক আজা আর সাগর সবন পুরান ছাড়িনেই নূয় জীবন য়েলে য়েলে ফুলে ফুলে এল বিজু এল বিজু রিপন চাকমা
১০ অজল মুরোর য়েল ঝারান পিবির পিবির বুয়েরান বর গাঙ পাড় ঝুব সেরে দোল দোল ফুল বাগান অমর শান্তি চাকমা
১১ ও সন্দর পুনং চান/কারি নিচাইত পরানান ঈশ্বর চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা
১২ যেই না বইন ফোর মঈন/দুর দেবাত তলে/সিদি গেলে নথায় দুক আইসে বেলে মনত সুক ঈশ্বর চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা
১৩ বিষু পাইচুয়া ডগেত্তে পয়ান কুইশালি গয়েত্তে রতি কান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
১৪ ইদি নাই কেয় জনে বানা আমি দি জনে লাঙ্যা লাঙুনি ঈশ্বর চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা
১৫ চোক পিজি মরে তুই/থারে থারে চে ন থেচ/তের চোগী হবে চালে /উ জনম ভাবি সেচ রিপন চাকমা
চাকমা তঞ্চঙ্গ্যা গান ছাড়াও আমি মারমা,আসাম, ত্রিপুরা গানে সুরারোপকরেছি তবে সেটি খুব বেশী নয়। আমার সুরারোপিত বাংলা গানের সংখ্যা অনেক। আমার চাকুরী কালীন সিএসপি জেলা প্রশাসক ছিলেন জনাব শফিকুল ইসলাম । তিনি সংস্কৃতিকে ভালোবাসতেন। তার সহযোগিতায় আমার সুরারোপে “সূর্যের সোনালী আলো” নামে একটি দেশাত্ববোধক বাংলা গানের ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছিল। ক্যাসেটটিতে কন্ঠ দিয়েছিলেন শাহানা দেওয়ান,নিরুপা দেওয়ান,রনেশ্বর বড়–য়া,মনোজ বাহাদুর। ক্যাসেটটির ধারা বর্ননায় কন্ঠ দিয়েছিলেন শাহরীয়ার রুমী। গানের গীতিকাররা ছিলেন শাহরীয়ার রুমী,সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা,মনোজ বাহাদুর,মুজিবুল হক বুলবুল ও মসিউর রহমান। ক্যাসেটটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তবে ক্যাসেটটির রেকর্ডিং ভালো ছিল না । কারিগরী ভাবে ভালো করার কোন ব্যবস্থাও তখন রাঙ্গামাটিতে ছিল না। গান গুলোর তালিকা ছিল নিম্নরুপঃ-
ক্রঃ গানের কথা গীতিকার কন্ঠ
১ সুর্যের সোনালী আলো একটি পাখীর ঘুম ভাঙিয়ে মুক্তির কবিতা শোনালো শাহরীয়রি রুমী কোরাশ
২ কবরের যোদ্ধারা শোন/রাতের আধার ভেঙে জাগবেনা আর কোন দিন ও শাহরীয়রি রুমী কোরাশ
৩ বাংলাদেশ এক রক্তিম সূর্যের নাম সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা নিরুপাওমনোজ
৪ এই দেশ আমার এই জন্মভুমি মনোজ বাহাদুর মনোজ
৫ দেখো রাজপথে চলছে হাজার গাড়ী মনোজ বাহাদুর রনেশ্বর বড়–য়া
৬ পূর্নিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি বলে গেছে সুকান্ত মনোজ বাহাদুর রনেশ্বর বড়–য়া
৭ জন্ম আমার হতো যদি যুগে যুগে এই পৃথিবীর পরে মসিউর রহমান শাহানা ও রনেশ্বর
৮ রক্তের ছোয়ায় ভিজে আছে আজো আমাদের পতাকা মুজিবুল হক বুলবুল কোরাশ
৯ স্বাধীনতা আমাদের সাধনা তুমি সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা কোরাশ
১০ স্বাধীনতা এমন একটি ফুল যে ফুল ফোটাতে ঝরে গেঝে লাখো প্রান মনোজ বাহাদুর কোরাশ
এর পর আমার পরিচালনায় রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের আর্থিক সহায়তায় প্রকাশিত হয় “শান্তির পায়রা” নামে আরেকটি দেশাত্ববোধক গানের ক্যাসেট। তদানিন্তন নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব ফসিউলাহ সাহেব ও পার্বত্য সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত আরেক কর্মী অঞ্জন দে এ বিষয়ে সার্বিক সহায়তা করেছিলেন। ক্যাসেটে গানগুলো ছিল নিম্নরুপÑ
ক্রঃ গানের কথা গীতিকার কন্ঠ
১ শান্তির পায়রা গুলো আজ উড়ছে পাখনা মেলে মনোজ বাহাদুর তনুশ্রী
২ সবুজ সবুজ বনানী পাহাড় ঘেরা এ মাটি সোনার চেয়ে খাটি রাঙামাটি মনোজ বাহাদুর মনোজ বাহাদুর
৩ এই দেশ আমার এই জন্মভূমি এই বাংলা আমার এই মাতৃভুমি মনোজ বাহাদুর মনোজ বাহাদুর
৪ স্বাধীনতা এমন একটি ফুল মনোজ বাহাদুর কোরাশ
৫ জন্ম আমার হতো যদি মশিউর রহমান তনুশ্রী
৬ সোনার বাংলা দেশ মরহুম সৈয়দ ফরিদ উদ্দীন সংগীতা
৭ হাজার শহীদ জীবন দিল আমার বাংলা মা তোর লাগি মনোজ বাহাদুর মনোজ বাহাদুর
৮ ঐ পায়রা পায়রা যে পাখনা উড়ায় মোঃ রুহুল আমিন অনন্ত চৌধুরী
৯ রক্ত ঝড়েছে রক্ত এসেছে যুবক তার চেয়ে বেশী শক্ত শাহরীয়ার রুমী হিমাদ্রী
১০ রক্তের ছোয়ায় ভিজে আছে আজো আমাদের পতাকা মুজিবুল হক বুলবুল কোরাশ
১১ সত্যের সারথি তুমি দূর্জয়ী বীর তুমি তুমি নেই তুমি নেই রনজিত বারৈ আরিফ ইকবাল পলাশ
১২ তুমি দেখোনি কোথাও এ আকাশ শাহরীয়ার রুমী সংগীতা
১৩ স্বাধীনতা সোনালী সূর্য উদার পায়রা মেলে ডানা মুজিবুল হক বুলবুল তনুশ্রী
১৪ বাংলাদেশ মনোজ বাহাদুর কোরাশ
তঞ্চঙ্গ্যাদের একটি মহা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বান্দরবানের বালা ঘাটা নামক স্থানে। সেই অনুষ্ঠানে তঞ্চঙ্গ্যাদের নিজস্ব নৃত্য গীত তৈরি করে দেয়ার জণ্য আমাকে অনুরোধ করা হলে আমি আমার সাধ্য মত চেষ্টা করি। জনাব রতি কান্ত তঞ্চঙ্গ্যার তত্বাবধানে তার পরিচালিত চারুকলা একাডেমীতে মহড়া ও সংগীত তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়। বান্দরবান সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাছাইকরা তঞ্চঙ্গ্যা শিল্পীদের এনে আমার কাছে হাজির করা হয়। আমার কাজ হচ্ছে তাদের তৈরি করা। আমার মনে হয় আমি সেই কাজটি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম। সে সময় সৃষ্টি হয়েছিল নিম্নলিখিত জনপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা গান সমুহের।
ক্রঃ গানের কথা গীতিকার
১ বিষু পাইচুয়া ডগেত্তে পয়ান কুইশালি গয়েত্তে রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
২ গুরুং গুরুং দেবা গুচের াগাইচ হুইয়ে কালা রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
৩ রাইংখ্যং গাঙ কাপ্তেই গাং মাতামুরি শঙক থুম রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
৪ ও রাঙা দা শুনি যা দগ পাচন দেগে জানইত রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
৫ মুই এ ঝর্নার ধারা নিত্য ঝর ঝর ঝরঙর রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
৬ এক্কো দাদারে ন দেলে ম পয়ানান হেন গরে রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
৭ জুমে জুমে বেরাই চালুং রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
সংগীতের পাশাপাশি আমার আকাংখা ছিল ভিডিও মিডিয়ায় কাজ করার। আমার সৌভাগ্য যে আমি ভিডিও লাইনে কিছু কিছু কাজ শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাংলাদেশের স্বনামধন্য অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক শ্রদ্ধেয় দারা শিকো মহোদয়ের সাথে আমি ভিডিও লাইনে কাজ করেছি। বাংলাদেশের আরেক স্বনামধন্য অভিনেতা আহসান আলী সিডনির সাথে ও আমি কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কারিগরী বিষয়ে আমি অনেক বই পুস্তক সংগ্রহ করে পড়েছি। আর বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে ইউটিউবে বিভিন্ন টিউটরিয়াল সহজলভ্য হওয়ায় ঘরে বসেই অনেক কিছূ শেখা সম্ভব হচ্ছে। নৃত্য গান অভিনয় বিষয় গুলো পরষ্পর পরষ্পরের পরিপূরক। আমি মনে করি অভিনয় না জানলে ভালো গায়ক বা গায়িকা হওয়া যায় না। কারণ কন্ঠে যদি অভিনয়ের বিষয়টি না থাকে তবে সেই গান মনকে ছুতে পারে না। গান যদি যথাযথ না হয় তা হলে নৃত্য শিল্পীর নৃত্য পূর্নতা পায় না। এ দুয়ের সমন্ময় না হলে অভিনয় ভালো হয় না।
আমি স্বপ্ন দেখতাম বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের গান,নৃত্য, নাটক ইত্যাদি নিয়মিত প্রচারিত হবে, আমরা সে সব অনুষ্ঠানাদি নিজেরা তৈরি করবো । এই সব কাজ করার জন্য আমাদের মধ্যে থেকে দ জনবল তৈরি হবে,একটি সুস্থ সংস্কৃতি ধারার উন্মেষ ঘটবে। কিন্তু এতো বছরেও তা হয়নি । এসব বিষয়ে আমি নেতৃ স্থানীয় অনেকের কাছে আমার মনের কথা বলেছিলাম কিন্তু তেমন সারা মেলে নি। ২০০৩-২০০৪ সনের দিকে আমি বিভিন্ন ভাবে প্রচেষ্টা নিয়েছিলাম । আমি সিটিভি তে অনেক অনুষ্ঠান করেছিলাম তদানিন্তন জেলা প্রশাসক জনাব শাহ আলম সাহেবের সহযোগিতায়। কিন্তু আমার আসল উদ্দেশ্য নিজেদের অনুষ্ঠান নিজেরা তৈরি করার বিষয়ে কারো কাছ থেকেই কোন সহযোগিতা পেলাম না। আমি আমার সংস্কৃতি মহলে আমার মনের আকাংখা প্রকাশ করার পর আমার কাছাকাছি অনেকেই আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করেছে। আমি তাদের দোষ দিতে চাই না কারণ তখনকার দিনে আমার চাওয়াটা সকলের কাছেই একটু বেশী মনে হয়েছিল। তবে আমি থেমে থাকি নি।
অবশেষে একটি ছোট হ্যান্ডি সনি ক্যামেরা দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। সাথে ছিল আমার বন্ধূ গীতিকার রিপন চাকমা। প্রথমে পরীামূলক ২/১টি কাজ করলাম । বাধ সাধলো কারিগরী বিষয়টি অর্থাৎ এডিটিং। থেমে গেলে চলবে না । আমার ছেলে হিমাদ্রী কে পাঠালাম এডিটিং শিখতে। সময় গড়িয়ে গেলো আরো কিছু দিন। অনভিজ্ঞ হাতে তৈরি হলো নূয় জিংগানি নামে একটি সেনিটেশনের প্রচারনা মূলক চাকমা ভিডিও ফিল্ম। এর পর তৈরি হলো পত্যা বেল ছদক নামে আরেকটি চাকমা ভিডিও। একটু সাহস বাড়লো তার পর তৈরি হলো চাকমা টেলি ফিল্ম কোচপানা। অনেক লিমিটেশনের মধ্যে তৈরি হওয়া টেলি ফিল্ম কোচপানা আমাকে অনুপ্রানিত করলো। দর্শকরা পছন্দ করলো এটি। আমিও সাহসী হলাম।
২০০৪ সনে উপজাতীয় সামাজিক ফোরাম কর্তৃক রাঙ্গামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমী ভবনে আদিবাসীদের মধ্যে বিশেষ কৃতিত্ত অর্জনকারীদের এক সন্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সন্মাননা প্রাপ্ত আদিবাসী ব্যক্তিত্বরা ছিলেন আদিাসী বস্ত্র শিল্পে মঞ্জুলিকা চাকমার মাতা,সাহিত্যে- শ্রী বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা,চারুকলায়-শ্রী রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা,কারু শিল্পে-শ্রী বিজয় কেতন চাকমা,শিায়-শ্রী বিপুলেশ্বর দেওয়ান আর সংস্কৃতি তে-শ্রী মনোজ বাহাদুর।
এ সম্মাননা আমাকে অনুপ্রানিত করেছিল। কারণ এই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মাননীয় চেয়ারম্যান শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা উপস্থিত ছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। সভাপতির আসন অলংকৃত করেছিলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রাক্তন উপদেষ্টা প্রয়াত শ্রী সুবিমল দেওয়ান,আর বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের তদানিন্তন চেয়ারম্যান ড.মানিক লাল দেওয়ান ও চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। তা ছাড়া অনুষ্ঠানে আরো বহু গন্য মান্য ভদ্রমহিলা ও ব্যাক্তি বর্গ উপস্থিত ছিলেন ।
আমি মনে করি এ সন্মাননা আমার এ যাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ট অর্জন অর্থাৎ আমার কাজের স্বীকৃতি। এর ফলে আমি পার্বত্য সংস্কৃতি েেত্র আমার অবদান বাড়িয়ে তোলার জন্য উৎসাহ বোধ করি। আমার মনে পড়ে শ্রদ্ধেয় সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার সেই মহা মুল্যবান কথা।
আমার পরিচালনায় নির্মিত এ যাবৎ কালের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন মিডিয়া প্রোডাক্টের একটি তালিকা নিম্নে পেশ করা হলো।
ক্রঃ বিবরন অর্থায়ন কারী
১ বিঝু ৮৯ চাকমা গানের ক্যাসেট নিজস্ব
২ এল বিঝু – নামে চাকমা গানের ক্যাসেট নিজস্ব
৩ হ্লে ঝারান নামে চাকমা গানের ক্যাসেট নিজস্ব
৩ সূর্যের সোনালী আলো নামে বাংলা দেশাত্ববোধক গানের ক্যাসেট রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন
৪ শান্তির পায়রা নামে দেশাত্ববোধক গানের ক্যাসেট রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ
৫ বৃষ্টি ভেজা রাত বাংলা আধৃনিক গানের ক্যাসেট শিল্পী- তানিয়া ইলা এশিয়া ভয়েস,ইকবাল রোড,ঢাকা
৬ নূয় জিংগানি সেনিটেশনের উপর প্রচারনা মূলক চামা ভিডিও নাটক স্থানীয় এনজিও
৭ পত্যা বেল ছদক, সেনিটেশনের উপর ভিডিও নাটক স্থানীয় এনজিও
৮ কোচ পানা চাকমা ভাষায় প্রেমের ভিডিও নাটক নিজস্ব
৯ যৌতুক একটি অভিশাপ বাংলা ভাষায় যৌতুক বিরোধী প্রচারনার ভিডিও নাটক নিজস্ব
১০ ’রাঙ্গামটির পাহাড়ে’ নামে রাঙ্গামাটি আইডলদের কন্ঠে পরিবেশিত অডিও সিডি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউট
১১ চাকমা ভাষা শিার ভিডিও সিডি
উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউট
১২ চান্দবি বার মাস নামে ঐতিহ্যবাহি গেংখুলী ভিডিও সিডি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউট
১৩ বিভিন্ন আদিবাসী শিল্পীদের গাওয়া এমপি থ্রি গানের সিডি, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউট
১৪ আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ভিডিও সিডি। উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউট
১৫ রাঙ্গামাটি জেলার আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় মিউজিক ভিডিও। তত্বাবধানে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ সিএইচটিডিএফ ইউএনিিডপি
আমি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের সাথে ১৯৮২ সন থেকে যুক্ত থেকে কাজ করেছি। মাঝ খানে সুগত চাকমা পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর আমাকে বাদ দেয়া হয়। পরিচালক সুপ্রিয় তালুকদারের আমলেও আমার কোন মূল্যায়ন তিনি করেন নি। তবে সৃষ্টিকর্তা যা করেন তা ভালোর জন্যই করেন। এর ফলে আমি নিজ উদ্যোগে কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি বর্তমান পরিচালকের দায়িত্বে থাকা রুনেল চাকমার সাথে খুব কম সময়ের জন্য পরিচিত। ১৯৮২ সনে আমাকে শ্রদ্ধেয় অশোক কুমার দেওয়ান যে ভাবে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। তিনিও সে ভাবে একদিন আমাকে আমন্ত্রন জানিয়ে পার্বত্য সংস্কৃতির উন্নয়নে তাকে সহায়তা করার অনুরোধ জানালেন। আমি সাদরে তা গ্রহণ করলাম।
তিনি সহকারী পরিচালক (সংস্কৃতি) থাকাকালীন তার উদ্যোগে আমার সার্বিক সহায়তায় প্রথম বারের মত ৭ এপ্রিল ২০০৮ থেকে ১০ এপ্রিল ২০০৮ পর্যন্ত আয়োজন করা হয়েছিল তিন দিন ব্যাপী আদিবাসী শিল্পীদের চিত্র কলা প্রদর্শনী ও আদিবাসী ভিডিও ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল(প্রদর্শনী)। অনুষ্ঠানটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক েেত্র এক সাড়া জাগানো ঘটনা ছিল। কারণ ১৯৭৮ সনে প্রতিষ্ঠিত উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের ইতিহাসে এ ধরণের কোন আয়োজন করার উদ্যোগ এর আগে কোন পরিচালকই গ্রহণ করেন নি। ইতোপূর্বে পরিচালক হিসেবে যারা ছিলেন তারা প্রায় সকলেই লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন বলেই হয়তো সরকারী টাকায় নিজেদের লেখা বিভিন্ন বই দেদারসে প্রকাশ করার সুযোগ হাতছাড়া করেন নি।
পাঠকের অবগতির জন্য জানাচ্ছি আমার সুরারোপিত চাকমা গানের একটি স্বরলিপির বই প্রকাশের অপোয় রয়েছে।
পার্বত্য সংস্কৃতির জন্য যারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে সমঝোতা বা সমন্ময় প্রয়োজন। আমি মনে করি সমম্বিত ভাবে একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। পার্বত্য চট্ট্রগামের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় দুটি বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর ফলে আদিবাসী শিল্পীরা তাদের সংগীত ও অন্যান্য বিষয়ে চর্চা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে। রাঙ্গামাটিতে বাংলাদেশ টেলিভিশন এর অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য ্একটি প্রেরণ কেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রটিকে অনুষ্ঠান রেকর্ডিং ও অনুষ্ঠান প্রচার উপযোগী করে তৈরি করা সম্ভব। আমি মনে করি পার্বত্য আদিবাসীদের সংস্কৃতি বিকাশের জন্য বর্তমান আকাশ সংস্কৃতির যুগে একটি টেলিভিশন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি সকলে ভেবে দেখবেন।